ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার প্রবণতা দুই দশক ধরে ক্রমেই বেড়েছে। এ নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিলেও মামলাগুলো তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রেও ঔদাসীন্য রয়েছে ব্যাংকগুলোর। এসব ব্যাংকের মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীদের সম্মানীও দেয়া হয় আসামিপক্ষের চেয়ে কম। রয়েছে জনবল সংকট। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছে না দেশের ব্যাংক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো। আবার এ অদক্ষতা দূর করার ক্ষেত্রে অমনোযোগিতার অভিযোগও রয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে দায়েরকৃত মামলার নিষ্পত্তি হতেও সময় লেগে যাচ্ছে দশকের পর দশক। যদিও অর্থঋণ আদালতে মামলাজট ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংকের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যাও চেয়েছেন অর্থঋণ আদালত।
ব্যাংকের খেলাপি ঋণের টাকা আদায় বেগবান করতে অর্থঋণ আদালত প্রতিষ্ঠা হয় ২০০৩ সালে। সারা দেশের অর্থঋণ আদালতগুলোয় খেলাপি হয়ে পড়া ঋণের অর্থ আদায়ে অসংখ্য মামলাও চলমান। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতেই মামলা আটকে রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার। কিন্তু সময়মতো শুনানিসহ এসব মামলার আদালত-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় তত্পর নয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। উপরন্তু করোনা প্রাদুর্ভাবের পর দীর্ঘদিন আদালত বন্ধ থাকায় মামলাজট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বিভিন্ন সময়ে আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলো মামলা পরিচালনায় অমনোযোগী হওয়ায় কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া শেষ হয় না। ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে মনোযোগী হলে মামলার গতি আরো বেড়ে ব্যাংকের দায় আদায় সম্ভব হতো। এ ব্যর্থতার কারণে ব্যাংকের পাশাপাশি দেশীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি সাধারণ আমানতকারীর টাকা খেলাপিদের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য গঠিত অর্থঋণ আদালতের উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার জন্য সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নোটিস পাঠানো ছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন অর্থঋণ আদালত।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নোটিসের জবাবে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডিক্রিদার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবীদের যে সম্মানী দেয়, একই মামলার বিবাদীপক্ষ নিজ আইনজীবীদের সম্মানী দেয় তার চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি। এ কারণে সরকারি ব্যাংকের আইনজীবীরাও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে শৈথিল্য দেখিয়ে থাকে। ব্যাংকগুলোর মামলা-সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীর সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় একসঙ্গে এত মামলা চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংক।
এছাড়া বিপুল পরিমাণ মামলা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক প্যানেল আইনজীবী নেই ব্যাংকগুলোর। এতে করে অনেক সময় মামলার শুনানির সময় ঋণগ্রহীতা উপস্থিত থাকলেও ব্যাংকের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকেন না, যার সুবিধা পায় ঋণখেলাপিরা।
একই কথা বলছেন, ব্যাংকগুলোর প্যানেল আইনজীবীরাও। তাদের ভাষ্যমতে, এ সমস্যা থেকে উত্তরণে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের পাশাপাশি প্যানেল আইনজীবীদের সম্মানীর পরিমাণ আরো বাড়ানো প্রয়োজন।
১ কোটি ২ লাখ ১৪ হাজার ৯৩৩ টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য জনতা ব্যাংক লিমিটেড লালদীঘি ইস্ট করপোরেট শাখা ১৯৯২ সালের ১৯ এপ্রিল একটি মামলা করে। দীর্ঘ ৩০ বছর অতিক্রান্ত হলেও বিবাদীর কাছ থেকে খেলাপি হওয়া ঋণের অর্থ আদায় করতে পারেনি ব্যাংক। মামলার নথিও বলছে, ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে টাকা আদায়েরও কোনো প্রমাণ নেই।
২০০৭ সালে এ নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যুর আদেশ জারি করা হলে ঋণগ্রহীতা শেখ আবদুল মোমিন হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (১০৩১/২০০৭) দায়ের করেন। হাইকোর্ট বিভাগের আদেশক্রমে ওই মামলার কার্যক্রম ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত স্থগিত থাকে। ২০১০ সালের ১০ মার্চ হাইকোর্ট এ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেন। এরপর ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডিক্রিদার ব্যাংক মামলাটি পুনরায় চালু করে খেলাপি ঋণ আদায়ের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ব্যাংকের এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে চরম অযোগ্যতা ও দায়িত্বহীনতা বলে আখ্যা দিয়েছেন আদালত।
পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি পুনরায় চালু হয়। এরপর দীর্ঘ পাঁচ বছরেও খেলাপি ঋণ আদায়ের কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেয়নি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে অর্থঋণ আদালত থেকে কারণ দর্শানোর আদেশের জবাবে ডিক্রিদার ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক উল্লেখ করেছেন, মামলার সংখ্যাধিক্যের তুলনায় তা পরিচালনার জন্য জনবল অপ্রতুলতার কারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সঠিক সময়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংক লালদীঘি ইস্ট করপোরেট শাখা উপমহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল মোস্তফা বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যাংকের আইনজীবীরা অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। ফলে মামলা পরিচালনার জন্য ব্যাংক নির্ধারিত ফি ছাড়া আর কোনো আর্থিক লাভ হয় না আইনজীবীদের। এজন্য আইনজীবীদের মধ্যে ব্যাংকের পক্ষে দাঁড়ানোর চেয়ে ঋণগ্রহীতা বা অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা থাকে বেশি। বিষয়টি উল্লেখ করে ব্যাংকের আইনজীবীদের ফি বাড়ানোর প্রস্তাব করেছি। এছাড়া আইনি কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের পাশাপাশি ব্যাংকের নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগেরও প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের একাধিক সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, একটি সরকারি ব্যাংক আইনি মতামতের জন্য আইনজীবীদের ফি দেয় মাত্র দেড় হাজার টাকা। যদিও বিবাদীপক্ষ নিয়োজিত আইনজীবীরা আইনি ফি পান এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। মামলার শুনানির সময় আইনজীবীর সম্মানী ৫-৭ হাজার টাকা দেয়া হলেও ঋণখেলাপিরা নিজেদের আইনজীবীদের সম্মানী দিচ্ছে এর চেয়ে ১০ গুণ বেশি। এতে করে ব্যাংকের আইনজীবীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করে, যার প্রভাব পড়ে ব্যাংকের মামলা পরিচালনায়। তাছাড়া জনবল সংকটের কারণেও ব্যাংকগুলোর মামলাকে নিষ্পত্তির পর্যায়ে নিয়ে যেতে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে।
সম্প্রতি পূবালী ব্যাংকের চট্টগ্রাম সিডিএ শাখার মামলায় সাজিল স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজের (ইউনিট-২) বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। এর পরও ব্যাংকটি আসামিদের ৭ শতাংশ সরল সুদে ৮ কোটি ৭২ লাখ ১ হাজার ৯২ টাকা পরিশোধের সুযোগ দেয়। এ বিষয়ে আদালতে সোলেনামাও (গ্রাহকের সঙ্গে সমঝোতার দলিল) দিয়েছে আসামিরা। সুদ মওকুফ করে ঋণ পরিশোধের ঘোষণা সংবলিত সোলেনামা সন্তোষজনক না হওয়ায় সেটি নামঞ্জুর করেছেন আদালত।
এ বিষয়ে আদালত বলছেন, অর্থঋণ আদালত আইনের ৩৮ ও ৪৫ ধারায় ডিক্রীকৃত টাকা পরিশোধ করে আপস-মীমাংসার সুযোগ রাখা হলেও ৪৫(২) ধারায় আইনে তা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া অবলোপনকৃত ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬/২/২০১৯ বিআরপিডি সার্কুলার নং-১ অনুযায়ী অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়েরের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। এ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণেরও নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এ সোলেনামায় অর্থঋণ আইনের বিধান লঙ্ঘন হয়েছে। আইনের ৪৯(২) ধারায় উল্লেখ রয়েছে, ব্যাংক ডিক্রীকৃত টাকা তিন বছরে ১২টি সমকিস্তিতে পরিশোধের জন্য সম্মত হতে পারবে। কিন্তু এক্ষেত্রে অর্থঋণ আইনের ৪২(২) ধারায় নির্ধারিত সময়সীমার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে সাত বছরে ২৮টি ত্রৈমাসিক কিস্তিতে পরিশোধের বিষয়ে ব্যাংক ও খেলাপি গ্রাহকের আপস-মীমাংসা হয়েছে। ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ডিক্রিদার ব্যাংকের এ পদক্ষেপ আইন ভঙ্গ করার শামিল।
সোনালী ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবীদের সম্মানীর হার সর্বশেষ পুনর্নির্ধারণ হয়েছিল ২০১৪ সালের ২৫ মার্চ। এরপর আট বছর ধরে আইনজীবীদের সম্মানী মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি। এতে করে ব্যাংকটির প্যানেল আইনজীবীরাও এখন অসন্তুষ্ট। বর্তমানে ব্যাংকটির অনেক মামলা অর্থঋণ আদালতে চলমান রয়েছে। সম্প্রতি ব্যাংকটির প্যানেল আইনজীবীদের সম্মানী বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি এ বিষয়ে একটি নোটিস জারি করে সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের লিগ্যাল ম্যাটার্স ডিভিশন। যদিও নতুন এ ফি বা সম্মানী হারটিও বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন ব্যাংকটির প্যানেল আইনজীবীদের অনেকে।
জানতে চাইলে সরকারি-বেসরকারি একাধিক ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী মোহাম্মদ নাঈম ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণের টাকা আদায়ে আইনজীবীদের সম্মানী প্রদানের বিষয়ে উদাসীন। বছরের পর বছর ব্যাংকের মামলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হলেও সম্মানীর হার বাড়ানোর বিষয়ে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। উল্টো করোনাকালে ব্যাংকগুলো মামলার আইনজীবীদের সম্মানী শতাংশের হারে কমিয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বিল আটকে রাখার কারণেও আইনজীবীরা ডিক্রিদারের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে হতাশার মধ্যে পড়ে যান। এসব বিষয়ই মামলা দ্রুত সময়ে নিষ্পত্তিতে বড় প্রভাব ফেলছে।









