বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকদের পর্ষদ বাংলাদেশের জন্য দুটি প্রকল্পে ৭০০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন করেছে। এ অর্থ বাংলাদেশে আশ্রিত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মৌলিক সেবা প্রদান এবং দুর্যোগ ও সামাজিক সহিষ্ণুতা তৈরিতে ব্যয় হবে। ২০১৭ সাল থেকে সহিংসতার কবলে পড়ে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির সংকটগুলোর মধ্যে একটি।

মঙ্গলবার (২৮ মে) বাংলাদেশ এবং ভুটানে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুলায়ে সেক বলেন, আমরা প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় বাংলাদেশ সরকারের উদারতাকে বিশেষভাবে প্রশংসা করি। আমরা স্থানীয় আশ্রয়দাতা গোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপের বিষয়টিও উপলব্ধি করি। এ সংকট এরই মধ্যে ৭ বছরে পদার্পণ করেছে এবং তাদের স্বল্পমেয়াদি ও জরুরি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও টেকসই সমাধান অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। আমরা এ জটিল সংকট মোকাবেলায় রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।"

সংকটের ৭ বছরে পদার্পণের এ সময়ে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের"ইনক্লুসিভ সার্ভিসেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ ফর হোস্ট কমিউনিটি অ্যান্ড ডিসপ্লেসড রোহিঙ্গা পপুলেশন (আইএসও) প্রকল্প এবং ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের হোস্ট অ্যান্ড রোহিঙ্গা এনহ্যান্সমেন্ট অব লাইভস (হেল্প)"প্রকল্প দুটি বাংলাদেশী আশ্রয়দাতা এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় বিশ্বব্যাংকের আইডিএ-২০ উইন্ডো ফর হোস্ট কমিউনিটিজ অ্যান্ড রিফিউজিস"এর আওতায় অনুদান হিসেবে এ অর্থায়ন করা হবে।

ইনক্লুসিভ সার্ভিসেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ ফর হোস্ট কমিউনিটি অ্যান্ড ডিসপ্লেসড রোহিঙ্গা পপুলেশন প্রকল্পটি রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯ লাখ ৮০ হাজার মানুষের জীবিকা ও অপরিহার্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা এবং জেন্ডার সহিংসতা মোকাবেলা ও প্রতিরোধ সেবার জন্য বিনিয়োগ করবে। প্রকল্পটি ১২ বছরের কম বয়সী ৩ লাখ রোহিঙ্গা শিশুকে শিক্ষা দেয়াসহ মানব পুঁজি উন্নয়নে বিনিয়োগ করবে।

‘আইএসও’ প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার এস. আমের আহমেদ বলেন,"বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুতির যে সংকট মোকাবেলা করছে, সেটি আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠী হোক বা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীই হোক, শেষ পর্যন্ত মানুষকে সহায়তার চ্যালেঞ্জ। আইএসও প্রকল্প অস্থায়ী কাজ, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, শিশু সুরক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবেলা ও প্রতিরোধ সেবা প্রদানে বিনিয়োগ, সুরক্ষা এবং মানব পুঁজি ব্যবহার করতে উভয় জনগোষ্ঠীর ঝুঁকিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সাহায্য করবে।

হোস্ট অ্যান্ড রোহিঙ্গা এনহ্যান্সমেন্ট অব লাইভস (হেল্প) প্রকল্প রোহিঙ্গা এবং আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ৬ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৌলিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটাবে এবং তাদের সহিষ্ণুতা বাড়াবে। পানি ও হাইজিন; জলবায়ুসহিষ্ণু সড়ক; নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্রের জরুরি বিনিয়োগ চাহিদা মেটাতে সাহায্য করবে, যা উৎপাদনশীল জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রকল্পটি সরকার এবং জনগণ উভয় পর্যায়ে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষতা তৈরিতেও গুরুত্ব দেবে।

‘হেল্প’ প্রকল্পের বিশ্বব্যাংকের টাস্ক টিম লিডার স্বর্ণা কাজী বলেন, দুর্যোগ এবং জলবায়ু সহিষ্ণুতা এখন আরো গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এ সংকট দীর্ঘায়িত হয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী খুব ঘনবসতিপূর্ণ জায়গায় বাস করে এবং তারা সামান্য মৌলিক সেবা পেয়ে থাকে। তাদের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীও চাপের মধ্যে রয়েছে। তাদের সীমিত সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ অব্যাহত রয়েছে। হোস্ট অ্যান্ড রোহিঙ্গা এনহ্যান্সমেন্ট অব লাইভস (হেল্প)" প্রকল্পটি অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামোর সহিষ্ণুতা জোরদারে বিনিয়োগ করবে এবং এগুলোকে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ করতে ও টেকসই রাখতে কাজ করবে।"

বাংলাদেশে থাকা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী ও শিশু এবং তাদের অর্ধেকের বয়স ১৫ বছরের নিচে। দুটি প্রকল্পই নারী, শিশু এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর ওপর সংকটের ভিন্ন ধরনের প্রভাবকে বিবেচনায় রেখেছে। জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা; নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, জেন্ডার স্পর্শকাতর ও জলবায়ু সহিষ্ণু স্যানিটেশন ও হাইজিন সুবিধা, নিরাপত্তার জন্য সৌর বিদ্যুতের সড়ক বাতি এবং কমিউনিটিভিত্তিক দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর নারীদের জন্য প্রশিক্ষণসহ নারী ও শিশুদের বিভিন্ন সমস্যা দূর করতে প্রকল্প দুটিতে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম রয়েছে।

এ সংকট শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাংকের ৫৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদান সহায়তা ও সে সব প্রকল্প থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির সংকট থেকে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা প্রকল্প দুটি কাজে লাগিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক এরই মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং তাদের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি, মৌলিক অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা, সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনা এবং আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য আয়বর্ধক সুবিধার জন্য সহায়তা দিয়েছে।

স্বাধীনতার পর প্রথম দিকে বাংলাদেশকে সহায়তাকারী উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে বিশ্বব্যাংক অন্যতম। তখন থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অনুদান ও সুদমুক্ত ঋণ দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সুদমুক্ত ঋণের অন্যতম বৃহত্তম গ্রহীতা।