খুলনায় টানা ভারী বর্ষণের ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু প্রকোপ। আগস্টের প্রথম সাত দিনে খুলনায় ২২৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এর পরের সপ্তাহে ৮ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সাত দিনে নতুন করে ৫৪৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া, আগস্টের প্রথম ১৪ দিনে মারা গেছে চার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী।

হাসপাতাল থেকে পাওয়া ডেঙ্গু রোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে খুলনা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নগরীর ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। ২২ নম্বর (কাস্টম ঘাট ও কয়লাঘাট), ২৮ নম্বর (পশ্চিম টুটপাড়া, মিয়াপাড়া ও কারাপাড়া), ২৯ নম্বর (হাজী মহসিন রোড, সাউথ সেন্ট্রাল রোড, টিবি ক্রস রোড ও গগন বাবু রোড) এবং ৩০ নম্বর (টুটপাড়া ও মতিয়াখালী) ওয়ার্ডকে রেড জোনে রাখা হয়েছে। ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২৪ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডকে অরেঞ্জ জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

খুলনার নয়টি উপজেলার মধ্যে রূপসায় ডেঙ্গু রোগীর চাপ হয়েছে। রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবছরই জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে।

চিকিৎসকরা বলছেন, সামান্য জ্বর বা দুর্বলতার পরও হঠাৎ অবস্থার অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমার পরের তিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় প্লাটিলেট কমে যাওয়া, রক্তচাপ কমা এবং লিভার, কিডনি বা মস্তিষ্ক আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বমি, তীব্র পেটব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি কিংবা অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন বলেও জানান তারা।

খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের ডেঙ্গু-সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে খুলনায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৭৯৬ জন। তাদের মধ্যে ৯৭ জন তখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ওই সময় ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল সাতজনের। চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছিলেন ৬৯২ জন।

আগস্টে এসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে বলেও জানা গেছে।

স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের বিপরীতে ১ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ৭৬৪ জন। অর্থাৎ মাত্র দুই সপ্তাহে আগের সাত মাসে ভর্তি হওয়া রোগীর প্রায় সমানসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৯৭ থেকে বেড়ে ২৩৭ জন হয়েছে। আর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ১১ জন।

১৪ আগস্ট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৬০ জনে। ৮ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত নতুন করে ৫৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৩১ জন বেসরকারি হাসপাতালে, ২০১ জন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ২১৪ জন খুলনার অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ১৪ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ২৩৭ জন। চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৩১২ জন।

সরজমিনে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দোতলায় গিয়ে করিডরজুড়ে রোগীদের ভিড় দেখা গেছে। ডেঙ্গু কর্নার রোগীতে পূর্ণ। হাসপাতালটিতে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ১৪৬ জন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা আরিফ মোহাম্মাদ বলেন, এমনিতেই শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। রোগীর চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কয়েক দিন ধরে রোগীর চাপ আরো বেড়েছে। প্রতিবছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকে। হাসপাতালের মেডিসিন, শিশু ওয়ার্ড এবং বারান্দা ও মেঝেতেও রোগী রাখতে হচ্ছে।

নগরীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালেও রোগীদের একইরকম ভিড় দেখা গেছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রফিকুল ইসলাম গাজী বলেন, হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের দুটি ওয়ার্ডে শয্যা মাত্র ২৫টি। সেখানে শুধু ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন ৪০ জন। ভর্তির জন্য শয্যার অনেক বেশি রোগী অপেক্ষা করছেন।

বেসরকারি খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, কোনো শয্যা ফাঁকা নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সব থেকে বেশি চাপ রয়েছে ডেঙ্গু রোগীর।

খুলনার সিভিল সার্জন মাহফুজা খাতুন বলেন, বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগী বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদেরও এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক থেকে দুই দিন জ্বর থাকলেও দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, খুলনার নয়টি উপজেলার মধ্যে রূপসা উপজেলায় ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেশি। অন্য আটটি উপজেলায় পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক। সব উপজেলায় ডেঙ্গু রোগীদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া, ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট নেই।