বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের জাতীয় হারে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে স্বাস্থ্য খাত। এ খাতে যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়, সময়মতো ব্যয় হয় না তা। পরিকল্পনার অভাবে সারা বছর অর্থের সঠিক ব্যবহার করতে না পারলেও অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে টাকা খরচের হিড়িক পড়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে।

চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে চিকিৎসা ও শল্য চিকিৎসা সরঞ্জামাদি খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ১৪২ কোটি টাকার বেশি। তবে সে অর্থ কাজে লাগাতে পারেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এখন অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে এ খাত থেকে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে অক্সিজেন, গ্যাস সরবরাহের বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য ২ কোটি ৮২ লাখ টাকা অর্থছাড়ের আবেদন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অর্থছাড়ের যে আবেদন করেছে, তাতে আটটি সরকারি হাসপাতালের বকেয়া বিল পরিশোধের তথ্য রয়েছে। আবার বকেয়া বিলের তালিকায় কেবল গেল অর্থবছরই নয়, আগের অর্থবছরগুলোরও বকেয়া রয়েছে।

বকেয়া বিল ছাড়ের পাশাপাশি রাজস্ব বাজেটের আওতায় স্বাস্থ্য স্থাপনা মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণেও অর্থছাড়ের আবেদনও করা হয়েছে। গত ৪ জুন এ রকম একটি আবেদনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ৯০ লাখ টাকা চাওয়া হয়।

অর্থছাড়ের আবেদনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থ একই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন খাতে পুনরুপযোজনের আবেদনও পড়েছে। গত ১৫ জুন কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অব্যয়িত অর্থ একই হাসপাতালের অন্যান্য খাতের পুনরুপযোজনের আবেদন করা হয়। আবেদনে অব্যয়িত ২ কোটি ১১ লাখ টাকা বিভিন্ন খাতে উপযোজনের আবেদন করা হয়। একই রকম আবেদন রয়েছে শেরেবাংলা নগর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিভিন্ন পুনরুপযোজনের আবেদন। ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বরাদ্দ অর্থও অন্যান্য খাতে উপযোজনের আবেদন রয়েছে।

এসব আবেদনের বাইরেও রয়েছে নবনিয়োগকৃত ৫ হাজার ৫৪ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স ও ২ হাজার চিকিৎসকের বেতন-ভাতাদি পরিশোধে বরাদ্দের আবেদন। তাদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ৫৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দের আবেদন করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের প্রতিফলিত হবে বলে আবেদনে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রায় পুরো বছরে অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করতে পারেনি। এখন অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে তাদের আকস্মিক ব্যয় চাহিদা মেটাতে চাপে পড়তে হচ্ছে অর্থ বিভাগকে। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড, অক্সিজেন ও ডাক্তারদের প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ দেয়া থাকলেও সেসব অর্থ খরচ করতে পারে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসক-নার্স-টেকনিশিয়ান সংকট ছাড়াও অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত নানা দুর্বলতা উঠে এসেছে। রয়েছে কারিগরি অদক্ষতা ও পরীক্ষাগারের অপ্রতুলতা। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে দরকার বড় বিনিয়োগ। কিন্তু এ নিয়ে যৌক্তিক পরিকল্পনা না থাকায় ঠিক কী পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হবে, তা চাইতেই পারে না সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো। আবার বরাদ্দকৃত অর্থের পুরোটা ব্যয়ও করতে পারে না তারা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য খাতে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়, সেটি সঠিক সময়ে ব্যয় হয় না। এডিপির জাতীয় বাস্তবায়ন হারে বেশ নিচের দিকে থাকে স্বাস্থ্য খাত। 

গত তিন অর্থবছরে প্রায় ৩ হাজার ২৮১ কোটি টাকার প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন করতে পারেনি এ খাত। স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগটি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে একসঙ্গে ছিল। সেই বছরে বাস্তবায়নহীন ছিল ৯৩৯ কোটি টাকা। ৬১টি প্রকল্পে ৫ হাজার ১২১ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছিল ৪ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। দেশের সার্বিক অর্জন প্রায় ৯৩ শতাংশ হলেও স্বাস্থ্য খাতে এ অর্থবছরে অর্জন ছিল ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অব্যয়িত ছিল স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ৭১১ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে ২৫৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে অব্যয়িত ছিল ৯৬৮ কোটি টাকা। ওই অর্থবছর জাতীয়ভাবে ৯৪ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হলেও স্বাস্থ্য খাতে বাস্তবায়ন ছিল ৯০ শতাংশের নিচে। অন্যদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে অব্যয়িত ছিল ১ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ৯২৭ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ৪৪৭ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন হয়নি। ওই অর্থবছর জাতীয় বাস্তবায়ন হার ৯৫ শতাংশ হলেও স্বাস্থ্য খাতে তা ছিল ৮৬ শতাংশ।

আগামী অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য মোট ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা বা ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এ বাজেটের বড় একটি অংশই অবশ্য খরচ হবে পরিচালন ব্যয়ে, যার পরিমাণ ১৬ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা। ঘোষিত বাজেটে করোনা মোকাবেলায় জরুরি চাহিদা মেটাতে ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাবও করা হয়েছে।

এসব বিষয়ে পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুজাহেরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়নে বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। এর পরও এ বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। আবার এ বরাদ্দের একটি বড় অংশই ব্যয় হয় বেতন-ভাতা, অবকাঠামো ও বিভিন্ন ক্রয় প্রকল্পে। অবশিষ্টাংশ ব্যয় হয় স্বাস্থ্যসেবায়, যার পরিমাণ খুবই কম। আবার বরাদ্দকৃত অর্থের বড় একটি অংশ নষ্ট হয় অপচয় ও দুর্নীতিতে। ফলে সাধারণ জনগণ খুবই কম বরাদ্দ পায় স্বাস্থ্যসেবায়। যথেষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ না থাকায় চিকিৎসাসেবার মান বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণসহ নানা উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয় না। স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়ন কার্যকর করে তুলতে হলে আমাদের অগ্রাধিকারের জায়গাগুলো নির্দিষ্ট করতে হবে। সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়নে যে কৌশলপত্রটি রয়েছে সেটি মনিটরিং ও সুপারভাইজ করতে হবে, যাতে সাধারণ জনগণ স্বাস্থ্যসেবার সুফল ভোগ করতে পারে।