দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর অব্যাহতির সুযোগ বাড়িয়ে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বলবৎ করার দাবি জানিয়েছে প্রযুক্তি খাত সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনগুলো। তারা বলছে, স্থানীয় সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবার প্রসার এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কর অব্যাহতির মেয়াদ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ খাতের বাণিজ্য সংগঠনগুলোর ব্যবসায়ী নেতারা এক সম্মিলিত সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি উত্থাপন করেন। বৃহস্পতিবার (৪ এপ্রিল) রাজধানীর কাওরানবাজারের বেসিস মিলনায়তনে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কনট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো), ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন (আইএসপিএবি) এবং ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) যৌথ এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা খাতের বার্ষিক অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার প্রায় ১৫০ কোটি ডলার সমপরিমাণ, পাশাপাশি রফতানি প্রায় ১৯০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এ খাতে সরকার কর ছাড় দেয়ায় বাজার এত বড় করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে চলমান তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর অব্যাহতির মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হবে। যার ফলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না।

তারা বলছেন, ‘রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০২৯ সাল নাগাদ সরকারের ৫০০ কোটি ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বিশ্বমানের সক্ষমতা তৈরি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিশ্চিতকরণ, দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে উৎসাহ প্রদান এবং স্থানীয় বাজার বড় করতে দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি সুবিধা বলবৎ রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। তাই এসব লক্ষ্য অর্জনে সরকারের ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় আনতে হবে। এজন্য গত ১০ মার্চ বেসিসসহ পাঁচটি তথ্যপ্রযুক্তি সংগঠনের নেতারা অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। 

সংবাদ সম্মেলনে বেসিস সভাপতি রাসেল টি আহমেদ বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে যদি করের আওতায় আনা হয়, সেটি মোট রাজস্ব আয়ের ১ শতাংশও হবে না। তথ্যপ্রযুক্তি খাত সবে মাত্র দাঁড়াতে শুরু করেছে, সামনে আমাদের দৌড়ানোর সময়। এ সময় শুধুমাত্র সরকারের এই অল্প আয়ের জন্য একটা সম্ভাবনাময় খাতকে হুমকির মুখে ফেলা ঠিক হবে না। যেহেতু সরকার দেশকে একটি স্মার্ট বাংলাদেশে রূপান্তর করতে চায়, তাই এ খাতে কর অব্যাহতি বজায় রাখা আগের চেয়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, আমরা কমপক্ষে ২০৩১ সাল পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ওপর কর অব্যাহতির দাবি করছি এবং এ ব্যাপারে বেসিস সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত আকারেও চিঠি দিয়েছে। আশা করছি সরকার স্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ও সম্ভাবনাময় এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে কর অব্যাহতির দাবি অতি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। এই খাতে কর অব্যাহতি মানে শুধু এটি না যে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠানের ওপর এ কর অব্যাহতি, এটি আসলে সমগ্র দেশের উন্নয়ন এবং স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।"  

বিসিএস সভাপতি সুব্রত সরকার বলেন, বাংলাদেশের স্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সুদূরপ্রসারী চিন্তা করে বিনিয়োগ করে, সেক্ষেত্রে কর অব্যাহতির ফলে কেবল মাত্র এই শিল্প দাঁড়াতে শুরু করেছে। তাই আমি মনে করি এ কর অব্যাহতির সুবিধা বলবৎ রাখার কোনো বিকল্প নেই।

বাক্কো সভাপতি ওয়াহিদ শরীফ বলেন, বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যে সাফল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা এ খাতে কর অব্যাহতি সুবিধা প্রদানের ফলেই অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে সরকার মনে করছে এ শিল্প খাত থেকে কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। কিন্তু এই শিল্পে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কর্মরত পেশাজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা ব্যক্তিগত আয়কর প্রদান এবং মূল্য সংযোজন কর প্রদানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

আইএসপিএবি সভাপতি মো. ইমদাদুল হক বলেন, তাছাড়া বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ইন্টারনেট সেবায় আমদানি নির্ভর আইএসপি সেক্টরের যন্ত্রপাতি ও ডলারের ঊর্ধ্বগতির বাস্তবতায় সব আইএসপি প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট সার্ভিসের ব্যয় বহন করে রেভিনিউর ওপর ১০ শতাংশ লাভ করতে পারে না। ফলে ইন্টারনেট সার্ভিসের বিলের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ (এআইটি) কর আরোপে সব আইএসপি প্রতিষ্ঠান ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইন্টারনেট সার্ভিসের ওপর ১০ শতাংশ এআইটি রহিত করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।

ই-ক্যাবের জ্যেষ্ঠ সহ সভাপতি মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন বলেন, প্রযুক্তি এবং আরো আনুষঙ্গিক অবস্থার পরিবর্তনের কারণে প্রযুক্তি খাতে আমাদের আরো কিছুদিন বিশেষ যত্ন ও সুবিধার প্রয়োজন। কর অব্যাহতি হলো তার একটি। এর মাধ্যমে এ খাত টেকসই ও সক্ষম হয়ে উঠবে।