কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, গত বছরের শেষ তিন মাসে ৮৭ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমেছে। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা ও পুনঃতফসিলের কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমেছে বলে জানা গেছে। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে খেলাপি ঋণের হালনাগাদ এ তথ্য জানানো হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর দেশের ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা ছিল খেলাপি। সে হিসাবে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা ছিল বলে জানিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময়ে বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশই ছিল খেলাপি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের শেষ তিন মাসে ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কমেছে। খেলাপি ঋণের হারও ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০০৯ সাল-পরবর্তী ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, সেগুলো খেলাপি হলেও নানা কৌশলে গোপন রাখা হতো। কিন্তু ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে লুকিয়ে রাখা খেলাপি ঋণ সামনে এসেছে। এ কারণে গত দেড় বছর খেলাপি ঋণ ক্রমাগত বেড়েছিল। এখন নগদ আদায় ও নীতি সহায়তার মাধ্যমে পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত বছরের শেষ তিন মাসে খেলাপি ঋণের তথ্যে আমরা সে উদ্যোগেরই ফল দেখছি। আশা করছি, আগামী দিনগুলোতেও খেলাপি ঋণ ধারাবাহিকভাবে কমে আসবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) খেলাপি ঋণের পাশাপাশি সঞ্চিতি (প্রভিশন) ঘাটতির পরিমাণও কমেছে। সেপ্টেম্বরে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে এ ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকায় নেমেছে। সে হিসাবে তিন মাসে সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ কমেছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা।
ডিসেম্বর শেষে খেলাপির হারে সবচেয়ে নাজুক ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। এ ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার এখন ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এ সময়ে ব্যাংকগুলো ৩ লাখ ২৮ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর ১ লাখ ২৭৮ কোটি টাকা প্রভিশন রাখার কথা থাকলেও তারা মাত্র ২৯ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা প্রভিশন রাখতে পেরেছে। সে হিসাবে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকায়। একই সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের স্থিতি ছিল ১৩ লাখ ৭৯ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা খেলাপিতে রয়েছে। এ হিসাবে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণের ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ খেলাপি। আর এ ব্যাংকগুলোর সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ২১৪ কোটি টাকায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর শেষে বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংকগুলো মোট ৪৬ হাজার ৬৭১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছিল। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকাই খেলাপির তালিকায় থেকে গেছে। সে হিসাবে এ ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এগুলোতে সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ ১৩ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা। আর বিদেশী ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ৬৬ হাজার ২২৩ কোটি টাকা ঋণের ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ খেলাপিতে রয়েছে। বিতরণকৃত ঋণের ২ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা খেলাপি তাদের। সব ধরনের ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি থাকলে বিদেশী ব্যাংকগুলোর প্রভিশনে উদ্বৃত্ত দেখা গেছে। এ ব্যাংকগুলোর ২ হাজার ২১৩ কোটি টাকা রক্ষিতব্য প্রভিশনের বিপরীতে তারা ২ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা প্রভিশন রাখতে পেরেছে। সে হিসাবে তাদের প্রভিশন উদ্বৃত্ত রয়েছে ৩৩৮ কোটি টাকা।










