যশোর সদর উপজেলার হরিণার বিলের আয়তন প্রায় ৫০৭ হেক্টর। সেখানে আবাদি জমি রয়েছে প্রায় ৪৮৫ হেক্টর। বিলটিতে বছরে তিনবার ফসলের আবাদ হয়। তবে কয়েক বছর ধরে জলাবদ্ধতার কারণে একবারের বেশি ফসল মিলছে না। চলতি মৌসুমেও জলাবদ্ধতার কারণে বিলের প্রায় আড়াই হাজার বিঘা জমির আমনের চারা নষ্ট হয়েছে। এতে কৃষকের কয়েক কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। অপরিকল্পিত ঘের তৈরির কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন কৃষক। এজন্য বিলটি বছরজুড়েই জলাবদ্ধ থাকছে।

বিলপারের কৃষক বলছেন, এ বছর আগস্টের শেষ দিকে ভারি বৃষ্টিপাতের পর হরিণার বিল জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এরপর সেপ্টেম্বরেও কয়েকবার ভারি বৃষ্টি হয়। অক্টোবরেও কয়েকদিন বৃষ্টি হওয়ায় বিলের পানি আরো বেড়ে গেছে। জলাবদ্ধতায় দুই দফায় আমনের চারা নষ্ট হয়ে গেছে।

সদর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ভারি বর্ষণের পর জলাবদ্ধতায় বিলের প্রায় ২৭২ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্ষতির আর্থিক মূল্য জানাতে পারেনি দপ্তরটি।

কৃষকের ভাষ্য, চারা নষ্ট হওয়ায় বিঘাপ্রতি তাদের সাড়ে ৬ হাজার টাকার ওপর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগ যে পরিমাণ জমির চারা নষ্টের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে; বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি।

জমির শ্রেণী পরিবর্তন করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। জমি ভরাট, পুকুর খননসহ অন্যান্য কাজে আইন অনুযায়ী অনুমোদন নিতে হয়। তবে হরিণার বিলে কোনো ঘেরের মালিক কৃষিজমির শ্রেণী পরিবর্তনের অনুমতি নেননি।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুজন সরকার (রাজস্ব) জানান, জমির শ্রেণী পরিবর্তনের একটি নীতিমালা রয়েছে। সেই নীতি অনুসরণ করে সেটি পরিবর্তনের অনুমতি দেয়া হয়। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক শ্রেণী পরিবর্তনের অনুমতি দেন।

সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান আলী জানান, হরিণার বিলে মূলত ধান আবাদ হয়। জলাবদ্ধতায় ২৭২ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারেননি তিনি।

বিল এলাকার আমন চাষীদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, কমপক্ষে ২ হাজার ৫০০ বিঘা জমির আমন চারা নষ্ট হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ ১৭ কোটিরও বেশি টাকা। চারা রোপণের আগে বীজতলা তৈরি, জমি চাষ, সার, সেচ ও পারিবারিক শ্রমসহ বিনিয়োগে এ ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতি বিঘায় ৫ হাজারেরও বেশি টাকা খরচ হয়।

কৃষক হযরত আলীর ছয় বিঘা জমি রয়েছে এ বিলে। বছরের বেশির ভাগ সময় সে জমি পানিতে ডুবে থাকে। বিলের তিন ফসলি জমি থেকে বছরে তার একবারের বেশি ফলন আসে না। এ কারণে মাছ ধরে ও অন্য কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় তাকে।

তিনি বলেন, ‘এবারো জলাবদ্ধতার কারণে ছয় বিঘা জমির আমনের চারা নষ্ট হয়ে গেছে। এতে আমার ৩০ হাজার টাকার বেশি লোকসান হয়েছে। ভেবেছিলাম ধান ওঠার পর কিছু অংশ বিক্রি করে সংসার খরচ চালাব। বাকি ধান দিয়ে চাল তৈরি করব। কোনোটাই সম্ভব হলো না।’

শাহীন গাজী নামে আরেক চাষী জানান, জলাবদ্ধতায় এ বছর তার নিজেরসহ লিজ নেয়া ২০ বিঘা জমির রোপা আমনের চারা নষ্ট হয়ে গেছে। এতে তার প্রায় ৮০ হাজার টাকার মতো আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সুশান্ত কুমার তরফদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্ষতির একটি পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতির শিকার চাষীরা যাতে লোকসান পুষিয়ে উঠতে পারেন, তেমন প্রস্তাবসংবলিত একটি চিঠিও পাঠানো হয়েছে। এক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদের আগাম রবি ফসল উৎপাদনে সার ও বীজসহ অন্যান্য উপকরণ প্রণোদনা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে একটি টিম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে আসবে।’