একজনকে গ্রেফতারও করেছে পুলিশ। শুধু এ হত্যাকাণ্ডই নয়, গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে দৈনিক গড়ে প্রায় ১০টি করে খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে আধিপত্য বিস্তার, দখল, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক কোন্দল ও পারিবারিক বিরোধ। খুন ছাড়াও এ দুই মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। বিভিন্ন স্থানে আসামি ধরতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন পুলিশ সদস্যরা।

সারা দেশের বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া খুনের মামলার তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধ পরিসংখ্যান তৈরি করে পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে খুনের ঘটনায় সারা দেশে ২৫০টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। পরের মাসে এ সংখ্যা বেড়ে ৩১৭-এ দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এ দুই মাসে ৫৬৭টি খুনের মামলা হয়েছে। এর আগের বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে খুনের মামলা হয়েছিল ৫৮৭টি। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে সারা দেশে খুনের মামলা হয়েছিল ৪৭৯টি। বিভিন্ন অভিযানে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ছিল ৪২টি। মার্চে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩টিতে। ডাকাতির ঘটনা এ সময়ে কিছুটা কমে এলেও শঙ্কা কাটেনি। গত ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশে ডাকাতির ৪২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। পরের মাসে এ সংখ্যা কিছুটা কমে ৩৯-এ এসেছে।

পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় ১৪টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। রহস্যজনক মৃত্যুর পর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে আরো আটজনের। এছাড়া গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক কোন্দল কিংবা পারিবারিক বিরোধে ঘটছে এমন নৃশংসতা। মায়ের পাশে ঘুমিয়ে থাকা সন্তানকে জানালার বাইরে থেকে গুলি করে হত্যা, এমনকি ছেলের হাতে বাবা নিহতের ঘটনাও ঘটছে এ নগরে। ১৪টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সাতটিতে ১৮ জন আসামি গ্রেফতার হলেও বাকিদের আনা যায়নি আইনের আওতায়। কয়েকটি হত্যার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়নি।

গত ২৭ এপ্রিল রাজধানীর কদমতলী থানার একটি ভাড়া বাসা থেকে শারমিন আক্তার শেলী (২৭) নামে এক নারী আনসার সদস্যের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, নিহত শারমিন আক্তার শেলী আনসার সদস্য ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি বরিশালে, সেখানকার শাহ আলম হাওলাদারের মেয়ে ছিলেন। কদমতলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ মুশাহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুরতহাল শেষে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে তাকে খুন করে দরজার বাইরে থেকে তালা দিয়ে পালিয়ে গেছে অপরাধী।’

দ্রুততম সময়ের মধ্যে খুনি চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির সৃষ্টির মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ড কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডগুলো বিভিন্ন ইস্যুতে হচ্ছে। হত্যাকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। সবার আগে দ্রুততম সময়ের মধ্যে খুনি চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বার্তা যায় যে অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। আরেকটি হচ্ছে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। এসব হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে আমরা দেখছি যে অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা পেছনে একটা গোষ্ঠী সম্পৃক্ত থাকে। তারা এ হত্যাকারীকে পার পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সোর্স ও তৎপরতা বাড়াতে হবে। অপরাধীদের অপরাধমূলক চিন্তায় পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তিত যে কৌশল বা অপরাধ সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তারা যেসব প্রযুক্তিগত বিষয় ব্যবহার করছে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে সোর্স বাড়াতে হবে।’

এর আগে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের তৃতীয় মেয়াদের (২০১৯-২৩) সময় গড়ে প্রতিদিন প্রায় নয়টি করে খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। পুলিশের হিসাবে ২০২৩ সালে সারা দেশে ৩ হাজার ২৩টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়। গড় হিসাব করলে প্রতিদিন আটটি করে খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে সে বছর। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অধিকাংশই রাজনৈতিক বিরোধী মতকে দমনের জন্য সংঘটিত বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগের বছরে ২০২২ সালে সারা দেশে ৩ হাজার ১২৬টি খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়। ২০২১ সালে সারা দেশে ৩ হাজার ২১৪টি খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়। গড় হিসাব করলে সে বছর প্রতিদিন প্রায় নয়টি করে খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর আগে ২০২০ সালে ৩ হাজার ৫৩৯টি এবং ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫৩টি খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়। গড় হিসাব করলে এ দুই বছর যথাক্রমে প্রতিদিন ১০টি করে হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। যদিও সে সময় অনেক হত্যা মামলা নথিভুক্ত না করার অভিযোগ ছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বিগত সময়ের অনেক হত্যাকাণ্ড নতুন করে মামলায় নথিভুক্ত হয়েছে।

শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাজ করছে। বিগত সময়ের তুলনায় অনেক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আগামী দিনে এ ধরনের অপরাধ হ্রাসে আরো বেশি কার্যকর উদ্যোগও রয়েছে।’