গতকাল রাজধানীতে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মেলার উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সাত দিনব্যাপী এ মেলা চলবে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত। এবারের মেলায় ১৪৬টি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে।
বিসিক ও বাংলা একাডেমি প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এ মেলার আয়োজন করে থাকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তারা এতে অংশ নেন। গতকাল মেলা ঘুরে দেখা যায় কৃষিজাত, কারুপণ্য, লোকজ পণ্য, পাটজাত-চামড়াজাত পণ্য নিয়ে হাজির হয়েছেন উদ্যোক্তারা। আছে জামদানি, শতরঞ্জি ও শীতলপাটির মতো জিআই পণ্য। এছাড়া কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, হস্ত ও মৃৎপণ্য, রূপ সাজসজ্জার সামগ্রী এবং বিভিন্ন লোকজ খাদ্যপণ্যের স্টলও আছে মেলায়। গতকাল সকালে শুরু হওয়া মেলায় বেচাকেনায় ব্যস্ত সময় পার করেছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। বৈশাখের আবহে ছিল উৎসবের আমেজ।
২০১১ সাল থেকে এ মেলায় ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি, কাপড় ও মৃৎশিল্পজাত পণ্য নিয়ে হাজির হন পটুয়াখালীর বাউফলের নারী উদ্যোক্তা শাহনাজ। এবারো হরেক রকমের জামা-কাপড় ও শাড়ি নিয়ে হাজির হয়েছেন তিনি। তার স্টলে পাওয়া যাচ্ছে ৩০০-৪০০ থেকে কয়েক হাজার টাকার পণ্য। গত কয়েক বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে এবারের মেলায় ভালো ব্যবসার আশা শাহনাজের। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বৈশাখ আমাদের ঐতিহ্য। সে প্রেক্ষাপট থেকেই টাঙ্গাইলের শাড়ি, মেয়েদের কাপড় নিয়ে আমি প্রতি বছর এ মেলায় অংশ নিই। এবারো দেশীয় পণ্য নিয়ে এসেছি। সকাল থেকেই মানুষ আসছেন, দেখছেন এবং পছন্দ হলে কিনছেন। এবার মানুষ অনেক উৎফুল্ল। তারা কেনাকাটা করবেন বলে আমি আশাবাদী।’
পাশেই আরেকটি স্টলে চুড়ি, নারীদের প্রসাধনী বিক্রি করছেন উদ্যোক্তা ঝিনুক। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রধান ব্যবসা ছিল ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। কিন্তু কালের পরিক্রমায় মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের বাজারে হারিয়ে যেতে শুরু করেছে অনেক কুটির শিল্প। দেশে উৎপাদিত এসব পণ্য এখন মৌসুমি হয়ে গেছে। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য কুটির শিল্পের প্রতি সুনজর প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্যমতে, দেশের প্রায় ১৫ লাখ পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এতে জড়িত মানুষের সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি, যার একটি বড় অংশ নারী। কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প খাত দেশের জিডিপিতে প্রায় ৩ থেকে ৭ শতাংশ অবদান রাখে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে ৪০ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করে। দেশের রফতানি আয়েও ভূমিকা রাখছে এ খাত।
দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করছেন বলে মনে করেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বিসিক ও বাংলা একাডেমি আয়োজিত বৈশাখী মেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘এ মেলা কেবল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। আমাদের অর্থনীতির প্রায় ১৫ শতাংশ আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত, আর বাকি ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির। যারা এ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, তারা অধিকাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক—ডকুমেন্টেড নন, দৃশ্যমান নন। আজকের এ আয়োজন সেই অদৃশ্য খাতের একটি দৃশ্যমান প্রতিফলন। এখানে অংশগ্রহণকারী ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা—এসএমই ও এমএসএমই খাতের প্রতিনিধিরা—দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কারুশিল্প, সৃজনশীল পণ্য ও কুটির শিল্পের ধারক ও বাহক। তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমেই এ মেলার প্রাণ সঞ্চার হয়েছে। বৈশাখী মেলায় আগত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই আমাদের অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করছেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় উদ্যোক্তারা অর্থনীতিতে টেনে নিয়ে চলছেন, বাঁচিয়ে রাখছেন।’
তিনি আরো বলেন, আমরা বিসিক এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাদের উন্নয়নে অংশীদার। তাদের প্রমোট করা আমাদের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। এক সপ্তাহ আগে একটি ক্রেডিট হোলসেলিং স্কিমের আওতায় বিসিকের শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ৩০০ কোটি টাকার একটি রিভলভিং ঋণ সুবিধা চালু করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য, অদূরভবিষ্যতে এ তহবিলকে ২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘আজকে অনেক উদ্যোক্তা মেলায় অংশ নিয়েছেন। দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্যের প্রসারের মাধ্যমে আমরা দেশীয় সংস্কৃতির প্রসার ও অর্থনীতিতে তাদের অবদান ত্বরান্বিত করতে পারব।’
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মাওলা, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব ওবায়দুর রহমান, বিসিক চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
এবারের মেলায় ১৬০টি স্টলের মধ্যে চামড়াজাত পণ্য সাতটি, জামদানি পণ্য ছয়, নকশিকাঁথা চার, বস্ত্র ৪৪, শতরঞ্জি পাঁচ, মণিপুরি শাড়ির দুটি স্টল রয়েছে। এছাড়া ১৩টি স্টলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কারুশিল্পী জোন, বাচ্চাদের রাইড ও বিনোদন জোন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুতুল নাচ ও বায়োস্কোপ দেখার সুযোগ রয়েছে।










