মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটে নাজুক সারা দেশ। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম নগরীর বাইরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল না পেয়ে পণ্যবাহী যানবাহনগুলো বিধিনিষেধ উপক্ষো করে সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রবেশ করছে। শহরের অভ্যন্তরে চলাচলকারী যানবাহনের পাশাপাশি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানগুলো দিনের বেলায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এলাকার ফিলিং স্টেশনে ভিড় করায় সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

গতকাল চট্টগ্রামের বিভিন্ন সড়কের ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনেই অকটেন বিক্রি বন্ধ। তবে বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশনে ডিজেল বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। দিনের বেলায় শহরের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট কিছু সড়ক ব্যতীত পণ্যবাহী ভারী যানবাহনের চলাচল সীমিত থাকলেও নিষেধাজ্ঞা মানছেন না পরিবহন মালিকরা। এতে ফিলিং স্টেশন ছাড়িয়ে ভারী যানবাহনের চাপ অনেক দূর পর্যন্ত গিয়ে ঠেকছে। সড়কের ওপর ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান কিংবা বড় বাসগুলোর দীর্ঘ সারির কারণে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অনাকাঙ্ক্ষিত যানজট তৈরি হচ্ছে।

বিষয়টি স্বীকার করে চট্টগ্রাম আন্তঃজেলা পণ্য পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান রুবেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের কারণে সারা দেশের যেকোনো জেলা থেকে এখানে পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ বেশি। সারা দেশ থেকেই এখানে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান পণ্য নিয়ে আসে, আবার পণ্য নিয়ে ফেরত যায়। পণ্যবাহী ভারী যানবাহনগুলো দিনের বেলায় শহরে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে অনেকেই সেটি ঠিকভাবে প্রতিপালন করতে পারছে না। আমরা পণ্যবাহী যানবাহনের জ্বালানি সরবরাহ ও আগের বিধিনিষেধ শিথিল করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে চিঠি দিয়েছি। সংকটকালে আগের বিধিনিষেধ শিথিল করে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের সহযোগিতা করা উচিত।’

দেশের সবচেয়ে বড় ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্যবাহী খোলা ট্রাক দিনের বেলায় শহরে প্রবেশে বিধিনিষেধ আছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গ কিংবা বিভিন্ন জেলা থেকে ছেড়ে আসা ট্রাকগুলো জ্বালানির অপর্যাপ্ততায় ১৫-১৮ ঘণ্টার পরিবর্তে দ্বিগুণ সময়ে গন্তব্যে যাচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পণ্যের সরবরাহ চেইনেও ব্যাঘাত ঘটছে। তাছাড়া চাহিদা ও সরকারের ঘোষিত রেশনিংয়ের নিয়মেও ডিজেল সংগ্রহ করতে না পারায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে শহরের ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে জ্বালানি নিতে হচ্ছে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানগুলোকে।

চট্টগ্রামের কদমতলী এলাকার একটি ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে পণ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাওয়া অনেক ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান জ্বালানির অভাবে এখনো চট্টগ্রামে ফিরতে পারেনি। আবার জ্বালানি সংগ্রহের জন্য পণ্য নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করতেও কয়েকদিন সময় লেগে যাচ্ছে। মহাসড়কের ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করলেও আপৎকালীন কেউ কেউ শহরের ভেতরে প্রবেশ করছে। অনেক সময় ট্রাফিক পুলিশ আটকালেও জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই দিনের বেলায় শহরের ভেতরে আসতে হচ্ছে। অনেকেই এ কারণে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান চালানো বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় পণ্যবাহী যানবাহনগুলোর জন্য সরকারের বিশেষ বিবেচনায় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা উচিত।’

সিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি সংকটে ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ায় সেখানে শৃঙ্খলা আনতে ট্রাফিক বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ডিসি (উত্তর-ট্রাফিক) নেছার উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্দর শহর হওয়ায় সিএমপির অভ্যন্তরে এমনিতে যানবাহনের চাপ অনেক বেশি। ব্যক্তিগত ও গণপরিবহন ছাড়াও চট্টগ্রাম শহরের অভ্যন্তরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ট্রাকসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহন আসে। সরকারের নির্দেশে ফিলিং স্টেশনগুলোতে শৃঙ্খলা ধরে রাখা ও যানজট এড়ানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে সংকীর্ণ সড়কগুলোতে থাকা ফিলিং স্টেশনগুলোতে সবচেয়ে বেশি যানজট কিংবা বিশৃঙ্খলার তৈরি হয়।’ যদিও ট্রাফিক বিভাগ তা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি সংকটে ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ায় সেখানে শৃঙ্খলা আনতে ট্রাফিক বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট থানাগুলো থেকে পুলিশের সদস্যরা গিয়ে যানজট নিরসন, সড়কের পাশে যানবাহনের সিঙ্গেল লাইনে অপেক্ষার বিষয়টি তদারকি করছেন। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান কিংবা বড় বাসগুলো নিষেধাজ্ঞা উপক্ষো করে শহরের ভেতরে চলে আসছে। বিশেষ করে শহরের প্রবেশমুখসংলগ্ন ফিলিং স্টেশন কিংবা ভারী শিল্প এলাকাকেন্দ্রিক ফিলিং স্টেশনগুলোতে রাতের বেলায় সিরিয়াল নিয়ে সহজেই জ্বালানি সংগ্রহের জন্য শহরে পণ্যবাহী যানবাহন প্রবেশ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে সংকটকালে কঠোর মনোভাবের পরিবর্তে সতর্ক করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা।

পরিবহন ব্যবসায়ীরা বলছেন, পণ্যবাহী ভারী যানবাহনগুলো স্বাভাবিক সময়ে মহসড়কসংলগ্ন ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে। এমনকি কোম্পানিভেদে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট ফিলিং স্টেশন নির্ধারিত করা থাকে। কিন্তু পণ্য নিয়ে আসা একটি পরিবহনকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পেয়ে পথে পথে দীর্ঘ বিরতি দিতে হচ্ছে। এ কারণে মহাসড়কেও জ্বালানি তেল নিতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। শহরের অভ্যন্তরে ঘন ঘন ফিলিং স্টেশন থাকায় দ্রুত তেল সংগ্রহের প্রয়োজনে কেউ কেউ বিধিনিষেধ না মেনে দিনের বেলায় শহরের মধ্যে প্রবেশ করছে বলে স্বীকার করেছেন তারা।

চট্টগ্রাম আন্তঃজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি গত ৪ এপ্রিল সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় পণ্য পরিবহন সেবাসহ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি, রফতানি ও দেশের কলকারখানাগুলোতে উৎপাদিত পণ্য সড়কপথে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে নিরাপদে পৌঁছে দেয়া ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, প্রাইম মুভারের মাধ্যমে ট্রান্সপোর্ট মালিকরা পরিবহন করে থাকেন। সরকার ও জনগণের স্বার্থে আমাদের সদস্যরা সর্বদাই এ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বাংলাদেশে আমদানি, রফতানি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত পণ্যের ৮৫ শতাংশ আমাদের সদস্যরা পরিবহন করে থাকে। চিঠিতে দাবি করা হয়, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকলেও দুর্যোগকালে সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হয় পণ্যবাহী পরিবহন মালিকরা। বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ হলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী, ফিলিং স্টেশনের অব্যবস্থাপনায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ও অন্যান্য জেলায় আগে তিন-চারদিনের মধ্যে পরিবহন সেবা প্রদান করলেও বর্তমানে জ্বালানির অপর্যাপ্ততায় এক সপ্তাহ সময় লাগছে।

সংগঠনটি দাবি করেছে, আগে পরিবহনগুলো নির্দিষ্ট পেট্রল পাম্প থেকে ১৫০-২০০ লিটার জ্বালানি তেল সংগ্রহ করলেও বর্তমানে ২০-৩০ লিটার পাওয়া যাচ্ছে। তাতেও ৩-৫ ঘণ্টা পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। তাছাড়া পণ্যবাহী যানবাহনগুলোর মূল শহরের ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ না থাকায় আরো বেশি বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। চট্টগ্রামভিত্তিক যানবাহনগুলো বন্দরসংশ্লিষ্ট পণ্যগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যাওয়ায় বন্দরের ওপরও প্রভাব পড়ছে। এ কারণে যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোর মাধ্যমে লোকসান এড়ানোর চেষ্টা করা হলে পণ্যের দামে প্রভাব পড়বে। এ অবস্থায় পণ্যবাহী যানবাহনে জ্বালানি সরবরাহে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তুলে নেয়ার দাবি করেছে সংগঠনটি।