সিরাজগঞ্জ জেলাকে দুধের রাজধানী বলা হয়ে থাকে। জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে বেশি দুধ উৎপাদন হয় শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া উপজেলায়। তাই সিরাজগঞ্জে তৈরি দই, মিষ্টি, ঘিসহ দুগ্ধজাত খাবারের দেশব্যাপী সুনাম রয়েছে। তবে এসব খাদ্যের মধ্যে জেলার উল্লাপাড়ার সলপে তৈরি ঘোলের সুনামের কথা আলাদাভাবে বিশেষ উল্লেখ্য। এখানকার তৈরি ঘোলের শতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছে বাংলা ৩০ চৈত্র ১৪২৮ মোতাবেক ১৩ এপ্রিল ২০২২ তারিখে।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় দুধে তৈরি সুস্বাদু পানীয় খ্যাতি পেয়েছে ‘সলপের ঘোল’ নামে। শুধু এ জেলায় বা এই জনপদে নয়, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছে সলপের ঘোলের সুনাম। সংশ্লিষ্টরা জানান, এ ঘোল তৈরির পেছনে রয়েছে ১০০ বছরের ঐতিহ্য।

স্থানীয় প্রবীণেরা বলছেন, একসময় এ সলপের তৈরি ঘোল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। প্রতিদিনের তৈরি ঘোল উল্লাপাড়ার সলপ রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে করে সকালের মধ্যেই কলকাতায়  পৌঁছে যেত। কালের বিবর্তনে ঘোলের এখন বড় বাজার তৈরি না হলেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় ক্রেতা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত্ত থেকে প্রতিদিন সলপে মানুষ যান ঘোল সংগ্রহের জন্য।

প্রতিদিন ভোরে গ্রামের খামারিদের কাছ থেকে সংগৃহীত গরুর দুধ আড়াই থেকে ৩ ঘণ্টা জ্বাল দেয়া হয়। নির্দিষ্ট সময় জ্বাল দেয়ার পর পাত্রে করে সারা রাত রেখে দেয়া হয় সে দুধ। সকালে জমে থাকা সে দুধের সঙ্গে চিনি ও অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয় সুস্বাদু ঘোল।

শীতের এ সময় কিছুটা চাহিদা কম থাকলেও গরম বেড়ে যাওয়ায় ঘোলের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া রমজানে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে দিনরাত কাজ করে চলেছেন ঘোল তৈরির কারিগররা। বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা এ ঘোল কিনতে ভিড় করছেন সলপে। বিক্রেতারা বলেন, প্রতিদিন এ এলাকায় ২০০ থেকে ২৫০ মণ ঘোল ও মাঠা বিক্রি হয়। বর্তমানে প্রতি লিটার ঘোল ৬০ টাকা, মাঠা ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আবার ঘোলের স্বাদ নিতে অনেকেই দূর থেকে এখানে আসেন। বিক্রেতারা এখানে বসার জায়গাও করে দিয়েছেন। ঘোলের সঙ্গে চাহিদা রয়েছে চিড়া ও মুড়কিরও। ঘোল বিক্রেতা আবদুল মালেক খান বলেন,  কতদিন থেকে এখানে ঘোল উৎপাদন হচ্ছে তা বলতে পারব না। আমি প্রায় ৫০ বছর ধরে ঘোল উৎপাদন করে বিক্রি করছি। জেনেছি ১০০ বছর আগে থেকে এখানে ঘোল তৈরি শুরু হয়েছে। তিনি আরো জানান, খ্যাতির সঙ্গে চাহিদা ভালো থাকায় অনেকে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হচ্ছেন। এখান থেকে পাইকারি দরে ঘোল কিনে নিয়েও অনেকে ব্যবসা করে জীবন-জীবিকা চালাচ্ছেন। পাবনার চাটমোহর থেকে সলপ এসেছেন দুই বন্ধু নয়ন সেখ ও আবু তাহের। তারা জানান, এখানকার ঘোলের সুনাম রয়েছে, তাই ঘোল নিতে এসেছি।

এ ঘোলের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে প্রতি বছর বৈশাখ মাসের প্রথম শুক্রবারে সলপে ঘোল উৎসবের আয়োজন করে সিরাজগঞ্জের প্রভাতী সংঘ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এ উপলক্ষে শত শত মানুষ ঘোল এবং চিড়া, মুড়কি খেতে ভিড় জমান।

প্রভাতী সংঘের অন্যতম সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ আব্দুল আজিজ সরকার বলেন, এক সময় সলপ রেলস্টেশনে যাত্রীরা নেমে রাত যাপন করতেন। তখন ঘোলের সঙ্গে চিড়া ও মুড়কি খেতেন। অনেক যাত্রী সঙ্গে নিয়েও যেতেন। সলপের জমিদার বূপেন্দ্র্র নাথ সান্যাল ও তার পূর্বপুরুষেরও পরিবারের প্রধান পছন্দের খাদ্য ছিল সলপের ঘোল। তিনি আরো বলেন, ১৯৯৪ সাল থেকে ঘোল উৎসব করে আসছি। তবে রমজানের কারণে এ বছর এ উৎসব হবে না।