১৯৯৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যান নেত্রকোনার আবুল কালাম। সেখানে প্রায় ১২ বছর একটি মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে বেসরকারি মসজিদগুলো সরকারীকরণ হলে চাকরি হারান। এরপর কফিলের সহায়তায় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। গত ৭ এপ্রিল ছুটিতে দেশে আসেন তিনি। পরিকল্পনা ছিল সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবার আমিরাতে ফেরার। কিন্তু গত ২৪ জুলাই মুঠোফোনে আসা একটি বার্তায় জানতে পারেন, তার ভিসা বাতিল করা হয়েছে। তবে এর কোনো কারণ জানানো হয়নি।

শুধু আবুল কালাম নন, সম্প্রতি ছুটিতে দেশে আসা কয়েক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশীর ভিসা বাতিল করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। কোনো পূর্ব ঘোষণা বা কারণ না জানিয়ে হঠাৎ এ সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন তারা। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে আমিরাতে বসবাস ও ছোট পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করা বাংলাদেশীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভিসা বাতিলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশীর সংখ্যা ৪ হাজার ৮০০। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি। কারণ ভিসা বাতিল হওয়া অনেকেই অনলাইনে নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে পারেননি।

১৯৭৬ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশী কর্মী যাচ্ছেন। একসময় এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার ছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিক্ষোভের পর ৫৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয় ইউএই সরকার এবং বাংলাদেশীদের ভিজিট ও কর্মী ভিসা বন্ধ হয়ে যায়। পরে সীমিত পরিসরে ভিজিট ভিসা চালু হলেও কর্মী ভিসা পুরোপুরি চালু হয়নি।

বন্ধ শ্রমবাজার পুরোপুরি চালু না হওয়ার মধ্যেই ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীদের ভিসা কারণ ছাড়াই বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কর্মী ও ব্যবসায়ীরা। আমিরাতে ফিরতে না পারলে অনেকের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও ব্যবসা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যবসায়ী আবুল কালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে আমিরাতে থাকছি। আমার সঙ্গে ছুটিতে আসা আরিফুল ইসলামেরও ভিসা বাতিল হয়েছে। আমি ছোট পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করছি। বর্তমানে একজনের কাছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। আমিরাতে ফিরতে না পারলে এ টাকা ফেরত পাওয়াও আমার জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।’

আরেক ব্যবসায়ী মানিক মিয়া বলেন, ‘২০০০ সাল থেকে আমি আমিরাতে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। দুটি কোম্পানিতে প্রায় ২০ জন কর্মী কাজ করেন। ছুটিতে দেশে আসার পর জুলাইয়ের ১৩ তারিখ আমার ভিসা বাতিলের মেসেজ পাই। কেন বাতিল হয়েছে কিছুই জানি না। আমার ভিসার মেয়াদ আছে আর ছয় মাস। এর মধ্যে যদি ফিরতে না পারি তাহলে ২৬ বছরের পরিশ্রমের ব্যবসা সব শেষ হয়ে যাবে।’

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৯৮ হাজার ৪২২ বাংলাদেশী কর্মী গেলেও ২০২৪ সালে তা কমে ৪৭ হাজার ১৫৮ এবং ২০২৫ সালে ১৩ হাজার ৭৫০ জনে নামে। চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গেছেন ১৯ হাজার ৬১৯ জন।

আমিরাতের বন্ধ শ্রমবাজার চালুর জন্য নির্বাচিত সরকারের কাছে অনেক বেশি প্রত্যাশা ছিল বলে জানান জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আমিরাতে ভিসা বন্ধ হয়ে গেলেও বর্তমানে আধা-সরকারি কিছু কোম্পানি ভিসার অনুমোদন পাচ্ছে, তবে সীমিত পরিসরে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আকর্ষণীয় শ্রমবাজারটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত চার হাজারের বেশি বাংলাদেশীর ভিসা বাতিল হওয়ার বিষয়টি আমরা অবগত আছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি জানে। সমস্যাটি কূটনৈতিকভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’