ভূমিহীনদের পুনর্বাসনে ২০০৬ সালে ঝালকাঠি পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে নির্মাণ করা হয় উত্তর কিস্তাকাঠি আবাসন প্রকল্প। ৬৫ একর খাস জমিতে তিনটি ব্যারাকে নির্মাণ করা হয় ৪৫০টি ঘর। তবে নির্মাণের পর আর কখনো সংস্কার করা হয়নি ঘরগুলো। এখন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে ঘরগুলো। অনেকে ভাঙা ঘর ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করছে। আবার অনেকে বাধ্য হয়ে জরাজীর্ণ ঘরেই বাস করছে। শুধু ঘর নয়, ৫০টি গভীর নলকূপও অকেজো হয়ে পড়েছে।

আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দারা জানান, সবক’টি বাথরুমের দরজা ভাঙা। নেই কোনো পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা।

কিস্তাকাঠি আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দা সোলেমা হোসেন বলেন, ‘এখানের সব ঘরের অবস্থা খুব খারাপ। বৃষ্টির দিনে চালে পলিথিন টানিয়েও রেহাই পাওয়া যায় না। আর শীতে তো কষ্ট আরো বেশি। ভাঙা বেড়া দিয়ে বাতাস ঢোকে। আঠা দিয়ে মোটা কাগজ বেড়ায় লাগিয়ে রাখি।’

রহিমা বেগম বলেন, ‘আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই। সবকিছুরই উন্নতি হয়, আমাদের ভাগ্যের উন্নতি আর হলো না। শীত ও বর্ষায় সীমাহীন কষ্ট করতে হয় আমাদের।’

এখানকার আরেক বাসিন্দা সুমন হোসেন বলেন, ‘প্রতিটি ঘরে তিন বান্ডেল করে টিনের প্রয়োজন। বিশুদ্ধ পানির সব নলকূপ নষ্ট। বাথরুমের দরজাও না থাকার মতো।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালে সুগন্ধা, বিষখালী ও বাসণ্ডা নদীর মোহনায় ৬৫ একর জমিতে স্থাপন করা হয় উত্তর কিস্তাকাঠি আবাসন প্রকল্প। নির্মাণের পর ১৮ বছর অতিবাহিত হলেও সংস্কার না হওয়ায় ৪৫০টি ঘরই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে অনেকে ঘর ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করেছে। নাগরিক সুবিধা বলতে কিছুই নেই এখানে, আছে শুধু নামে মাত্র ঘর। ৪৫০টির ঘরে আড়াই হাজারের অধিক মানুষের বসবাস। ঘরের টিনের চালাগুলো মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। গত বর্ষা মৌসুমে এখানকার বাসিন্দাদের কষ্টের সীমা থাকে না। বৃষ্টির পানিতে ভিজে যায় বিছানাসহ ঘরের মালপত্র। শুধু ঘর নয়, ৫০টি গভীর নলকূপও অকেজো। চলতি বছর কয়েক ধাপে ভারি বৃষ্টি হওয়ায় বসতঘরে পানি প্রবেশ ঠেকাতে না পেরে ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলেও গেছে এখানকার অনেক পরিবার। শীত মৌসুমেও ঘরের বেড়া পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছে সবাই।

এ বিষয়ে উত্তর কিস্তাকাঠি আবাসন প্রকল্প সমবায় সমিতি-১-এর সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময় আবাসনের এসব সমস্যার কথা কর্তৃপক্ষকে জানালেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিগত সরকার বিভিন্ন জায়গায় নতুন নতুন আবাসন ও ঘর নির্মাণ করলেও আমাদের এখানের তিন হাজার বাসিন্দার ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রতিটি ঘরের টিন পরিবর্তন, শৌচাগার ও গোসলখানাগুলো সংস্কার এবং নষ্ট হয়ে থাকা নলকূপগুলো মেরামত করে ব্যারাকগুলো বসবাসের উপযুক্ত করা প্রয়োজন।’

সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোজাম্মেল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কিস্তাকাঠি আবাসন প্রকল্প অনেক পুরনো। সবকিছু নতুনভাবে নির্মাণ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। ছয় বছর আগে সংস্কারের জন্য চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। তারপর ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘরপ্রতি দুটি করে টিন লাগানো হয়েছিল। ঘর বরাদ্দের পর ১৭ বছরের মধ্যে এ মেরামত খুবই নগণ্য।’

সরজমিনে জানা গেছে, প্রতি পাঁচটি পরিবারের জন্য একটি করে শৌচাগার ও গোসলখানা রয়েছে এখানে। শৌচাগারগুলো এখন ব্যবহারের অযোগ্য। পয়োনিষ্কাশনের জন্য ব্যারাকে কোনো ড্রেন না থাকায় ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত পানি যাচ্ছে এখানকার পুকুরে। আর দূষিত হচ্ছে গোটা পুকুরের পানি। আবার সেই পুকুরের পানি ব্যবহার করে বাসিন্দারা নানা রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে। দু-একজন নিজের মতো ঘর মেরামত করে বসবাস করলেও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সংস্কার না করেই দিনের পর দিন কষ্টে কাটাচ্ছে।

ঝালকাঠি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, ‘প্রকল্পের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ নিরসনের জন্য যথাসাধ্য কাজ করা হবে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।’