প্রকাশক ও বিক্রেতাদের দাবি, বর্তমানে একটি অরিজিনাল বইয়ের বিপরীতে বিক্রি হচ্ছে প্রায় আটটি কপি বই। তাদের অভিযোগ, রাজধানীর নীলক্ষেতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা চক্র ঢাকার বিভিন্ন ছাপাখানায় জনপ্রিয় বই নকল করে ছড়িয়ে দিচ্ছে সারা দেশে। নতুন বই প্রকাশের তিন-চারদিনের মধ্যেই বাজারে আসছে নকল সংস্করণ। বাংলাবাজার ও ফুটপাতের দোকানের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে চলছে এসব বইয়ের বিক্রি। এতে লেখক-প্রকাশকের বিনিয়োগ ও মেধাস্বত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা না থাকায় ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে পাইরেসির বাজার।
নীলক্ষেত ও বাংলাবাজারে সরজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাইরেসি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে সৃজনশীল ফিকশন ও নন-ফিকশন বইকে কেন্দ্র করে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, একটি বইয়ের শুধু বাঁধাই ও প্রচ্ছদ তৈরিতেই ন্যূনতম প্রায় ৫৬ টাকা খরচ হয়। অথচ পাইরেটেড বই বিক্রেতারা ৯৯৯ টাকায় নয়টি বইয়ের প্যাকেজের মতো চটকদার অফার দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে লেখক ও প্রকাশকের শ্রম ও বিনিয়োগকে মূল্যহীন করে পুরো প্রকাশনা শিল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন প্রকাশনাসংশ্লিষ্টরা।
নীলক্ষেতের ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্যমতে, বর্তমানে বাজারে অরিজিনাল বইয়ের চেয়ে পাইরেটেড বইয়ের আধিপত্যই বেশি। বিক্রেতা ও বিক্রয়কর্মীদের দাবি, সৃজনশীল বইয়ের মোট বিক্রির মাত্র ২০ শতাংশ এখন অরিজিনাল, বাকি ৮০ শতাংশই পাইরেটেড। বাংলা ও ইংরেজি ফিকশন এবং নন-ফিকশন বইয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। তবে দেশী ও বিদেশী বইয়ের কপিরাইট সুরক্ষায় আইনগতভাবে কোনো পার্থক্য না থাকলেও পাইরেসি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্বিমুখী অবস্থান দেখা গেছে।
আলিফা বুকস সেন্টারের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলী মিয়াজি নিজেও পাইরেটেড বই ছাপিয়ে বিক্রি করেন, তবে শুধু ইংরেজি ভাষার বই। তার দাবি, দেশীয় প্রকাশকদের বাংলা বই নকল করা অপরাধ হলেও বিদেশী ইংরেজি বই কপি করা ততটা সমস্যাজনক নয়। নীলক্ষেতে ভারতীয় ও ইংরেজি বই নকল করে বিক্রি করা মলি প্রকাশনী ও গোল্ডেন বুক সেন্টারসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের যুক্তি দিয়েছেন।
তারা জানান, নীলক্ষেতে ভারতীয়সহ বিদেশী ইংরেজি বই বিক্রি করা অধিকাংশ দোকানই কপি বই উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। সাধারণত পিডিএফ থেকে এসব বই ছাপিয়ে নীলক্ষেতসংলগ্ন গাউসুল আজম মার্কেট ও বাকুশাহ মার্কেটে বাঁধাই করা হয়। কখনো জনপ্রিয় কোনো বইয়ের একটি অরিজিনাল কপি আমদানি করে সেটির অনুরূপ নকল সংস্করণ তৈরি করা হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশীয় বই নকল করলে কপিরাইট আইনে মামলার ঝুঁকি থাকলেও বিদেশী বইয়ের ক্ষেত্রে তেমন ঝুঁকি নেই। তাদের ভাষায়, ‘বিদেশী বইয়ের কপিরাইট থাকে না। সেসব দেশেও তো পিডিএফ ব্যবহৃত হয়।’
তবে এর বাইরেও নীলক্ষেত বই বাজারেই দেশের সৃজনশীল প্রকাশনাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এক বিশাল পাইরেসি সিন্ডিকেট, যেখানে কপিরাইটের অধীন থাকা নতুন ও পুরনো বাংলা বইয়ের পাইরেটেড কপি উৎপাদন শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং চট্টগ্রামে আরো বৃহদাকারে, এমনকি বগুড়াতে হচ্ছে বলেও তথ্য সামনে আসে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নীলক্ষেতে ২০ বছর ধরে ব্যবসা করা এক ব্যবসায়ী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিদিন ১ হাজার টাকার অরিজিনাল বাংলা বই বিক্রি হলে এর বিপরীতে পাইরেটেড বই বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার টাকার। সৃজনশীল বইয়ের বাজারের বড় অংশ নকল বইয়ের দখলে চলে যাওয়ায় অরিজিনাল প্রকাশকদের মাসিক মুনাফা ৫ লাখ টাকা থেকে কমে প্রায় ১ লাখ টাকায় নেমেছে।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বিক্রেতা বণিক বার্তাকে জানান, তারা শুধু নীলক্ষেত নয়, বাংলাবাজার থেকেও কপি বইয়ের সরবরাহ পান। অনেক ক্ষেত্রে নকল বই কিনতে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি ও ভয়ভীতিও দেখানো হয়।
বাংলাবাজার ও নীলক্ষেতের প্রকাশক, ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে শক্তিশালী পাইরেসি চক্রের তথ্য পাওয়া যায়। তাদের অভিযোগ, নীলক্ষেতকেন্দ্রিক চক্রটি সারা দেশে পাইরেটেড বইয়ের উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। চক্রটির মূল হোতা হিসেবে তারা ‘কাইল্লা মানিক’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছেন। তাদের দাবি, একসময় নীলক্ষেতে ‘সাহিত্য সম্ভার’ নামে ছোট একটি দোকান চালানো মানিক এখন ঢাকার পাইরেসি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। তার সঙ্গে বিনিয়োগকারী হিসেবে ১৫-২৬ জনের একটি চক্রও রয়েছে। একাধিক প্রকাশক জানিয়েছেন, তারা নিজ উদ্যোগে পুলিশ নিয়ে এসব অবৈধ কারখানায় অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের ধরলেও এক সপ্তাহের মধ্যেই তারা ছাড়া পেয়ে আবার আগের মতোই কাজ শুরু করেন।
বর্তমানে পাইরেসির সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী প্রকাশনীর একটি ‘অন্যধারা’। প্রকাশনীটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক হোসেন বলেন, ‘পাইরেসির মূল হোতা ১৪-১৫ জনের একটা গ্রুপ। নীলক্ষেত থেকে নানাভাবে এটা সারা দেশে ছড়াচ্ছে। নতুন বই আসার তিন-চারদিনের ভেতরে তারা পাইরেসি করে ফেলছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমরা যারা প্রকাশক তারা যেন শখে বই বের করি। আর ওরা নিজেরাই প্রকাশক হয়ে গেছে।’
পাইরেসি এখন নীলক্ষেতের ফুটপাত ছাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। এক ব্যবসায়ী জানান, একটি বইয়ের মানসম্মত বাইন্ডিং খরচ ৩০ টাকা আর কভার করতে লাগে ২৬-২৭ টাকা। অর্থাৎ কাগজ-কালি ছাড়াই খরচ হয় ৫৬ টাকা। সেখানে ১০০ টাকায় বই বিক্রি করা পাইরেসি ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তার মতে, অনলাইন ক্রেতাদের ৯০ শতাংশই এভাবে বিজ্ঞাপন দেখে আকৃষ্ট হয়ে নিম্নমানের ডুপ্লিকেট বই কিনে প্রতারিত হচ্ছেন।
তবে উচ্চ শিক্ষায় বিদেশী পাঠ্যবইয়ের ফটোকপি সংস্করণকে অনেকটা ‘অনিবার্য’ বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীদের একাংশ। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় অনেক অরিজিনাল বইয়ের দাম ৩৪ হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা হওয়ায় মেডিকেল ও প্রকৌশলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পক্ষে সেগুলো কেনা সম্ভব নয়। তারা জানান, মেডিকেলের চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় ইউনাইটেড পাবলিকেশন্সেই এক দিনে ‘ডেভিডসনস প্রিন্সিপলস অ্যান্ড প্র্যাকটিস অব মেডিসিন’-এর দুই থেকে আড়াই হাজার কপি বিক্রি হয়। এক ব্যবসায়ীর দাবি, বইটির সুলভ কপি না থাকলে সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালানোই কঠিন হয়ে পড়ত।
নীলক্ষেতে মেডিকেল বইয়ের অন্যতম বড় সরবরাহকারী ইউনাইটেড পাবলিকেশন্সের বিক্রয়কর্মীরা জানান, দেশীয় লেখক ও প্রকাশকের বই নকলের ক্ষেত্রে কপিরাইট আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলেও বিদেশী বইয়ের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। এসব বইয়ের সফট কপি বা পিডিএফ অনলাইনে পাওয়া যায় এবং উন্নত বিশ্বের শিক্ষার্থীরাও সেগুলো ব্যবহার করেন। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের পড়ার সুবিধার্থে সেই পিডিএফগুলো ছাপিয়ে সুলভ মূল্যে তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয় বলে দাবি করেন বিক্রয়কর্মীরা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইরেসির এ নৈরাজ্য বন্ধ করতে শুধু নীলক্ষেতে অভিযান চালালেই হবে না; ফেসবুক-টিকটকের মাধ্যমে বিস্তৃত পাইরেসি নেটওয়ার্ক এবং প্রকাশনা সংস্থার ভেতরের অসাধু চক্রকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি গ্রন্থস্বত্ব আইনের সংস্কার ও কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন প্রকাশকরা।
জনপ্রিয় প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম পাইরেসি সিন্ডিকেটকে ‘মাফিয়া চক্র’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘এটি এত বড় একটি চক্র যে পাইরেসির মাধ্যমে এর সদস্যরা বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছে।’ আদর্শ প্রকাশনীর প্রকাশক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘মূল প্রকাশকদের সম্পাদনা, কর্মীদের বেতনসহ নানা খাতে বড় অংকের ব্যয় করতে হয়। কিন্তু পাইরেটেড বই উৎপাদনকারীদের মূলত কাগজ ও ছাপার খরচ বহন করতে হয় বলে তারা অনেক কম দামে বই বিক্রি করতে পারে। এমনকি ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে মাত্র ১০০ টাকায় ৫০টি বইয়ের পিডিএফ বিক্রি করা হচ্ছে, যা প্রকাশকদের আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে।’
প্রকাশকদের অভিযোগ, পাইরেসি প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস এখন পর্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। অন্যদিকে বই নিবন্ধনের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরও যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই আইএসবিএন দিয়ে থাকে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের সিনিয়র সহকারী সচিব মোস্তাক আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগে নীলক্ষেতে মূলত বিদেশী বই ও পাঠ্যবইয়ের পাইরেসি হতো। এখন তা দেশীয় সৃজনশীল বইয়ের বাজারও দখল করে নিয়েছে। প্রকাশকরা আমাদের জানান, কোনো বইয়ের ৩০০ অরিজিনাল কপিও বিক্রি হয় না, অথচ একই বইয়ের হাজার হাজার পাইরেটেড কপি বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো মৌলিক বই বাজারে আসার আগেই এর পাইরেটেড সংস্করণ বের হয়ে যাচ্ছে।’










