বিশ্ববাজারে প্যাকেজিং পণ্যের চাহিদা প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলারের। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাংলাদেশের প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ খাতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদিত পণ্যের মানোন্নয়ন এবং দক্ষ জনবল বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এজন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরিতে বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তারা।

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল প্যাকেজিংয়ের ওপর তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী ও গবেষকরা এ কথা বলেন। ‘সাসটেইনেবল অ্যান্ড কোয়ালিটি প্যাকেজিং ফর লোকাল অ্যান্ড গ্লোবাল মার্কেট’ শীর্ষক এ প্রশিক্ষণের আয়োজক বাংলাদেশ প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএএমইএ)। সহযোগিতায় রয়েছে এশিয়ান প্যাকেজিং ফেডারেশন (এপিএফ)।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, ‘তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে প্যাকেজিং ও অ্যাকসেসরিজ খাত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে এ খাতের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এজন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনবল তৈরি এবং মানসম্মত উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’ পাশাপাশি প্যাকেজিং খাতের জন্য বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠায় সরকারের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন বিকেএমইএর সভাপতি।

বিপিএএমইএর সভাপতি মো. শাহরিয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনস বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শিল্পী বেগম। এছাড়া আরো উপস্থিত ছিলেন এপিএফের সাবেক সভাপতি ও বিপিএএমইএর সাবেক সভাপতি সফিউল্লাহ চৌধুরী, অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি (অর্থ) মোজাহারুল হক শহীদ এবং টেস্টিং ল্যাব, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম কমিটির আহ্বায়ক মনির উদ্দিন আহমেদ।

বিপিএএমইএর সভাপতি মো. শাহরিয়ার বলেন, ‘দেশের অ্যাকসেসরিজ ও প্যাকেজিং খাত বর্তমানে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এমন কোনো পণ্য নেই যার জন্য প্যাকেজিংয়ের প্রয়োজন হয় না। মালিক ও কর্মীদের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় এ খাতে এখন পর্যন্ত শ্রমিক অসন্তোষের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।’

অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে প্যাকেজিং পণ্যের চাহিদা প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলারের। এ বাজার ধরার জন্য আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হয়ে প্যাকেজিং পণ্য প্রস্তুত করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্যাকেজিং পণ্যের গুণগত মান বাড়ানো এবং এ খাতে কর্মরতদের আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন শ্রেণী, গুণগত মান পরীক্ষার পদ্ধতি, করোগেটেড ফাইবার বক্স ও করোগেটেড ফাইবার বোর্ড, প্লাস্টিক প্যাকেজিং এবং প্যাকেজিংয়ের গুণগত মান মূল্যায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

আয়োজকরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্যাকেজিং পণ্যের মানোন্নয়ন ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা কাজে লাগাতে হলে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন এবং গুণগত মান যাচাইয়ের সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিল্পসংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞ তৈরির সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বিপিএএমইএ জানিয়েছে, প্রশিক্ষণে দেশী-বিদেশী ৩৫ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নিচ্ছেন। বিদেশী প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে রয়েছেন শ্রীলংকার একজন প্রতিনিধি। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনস বিভাগের পাঁচ শিক্ষার্থীকে বিশেষ ছাড়ে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ খাতে উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে এ সুযোগ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে আয়োজক সংগঠনটি।

প্রশিক্ষণের প্রথম দিন প্রশিক্ষক হিসেবে দুটি সেশন পরিচালনা করেন এপিএফের অনারারি সদস্য ও সাবেক সচিব এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব প্যাকেজিংয়ের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. নারায়ণ চন্দ্র সাহা। প্রথম সেশনে তিনি বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব টেকসই প্যাকেজিংয়ের নতুন ধারণাগুলো তুলে ধরেন। পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রফতানি বাজারের জন্য বিশেষত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ শিল্পে এর প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যবহারের মানদণ্ড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। দ্বিতীয় সেশনে বিভিন্ন ধরনের কাগজ ও পেপার বোর্ডের মৌলিক বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

এ সময় কার্টন তৈরিতে ব্যবহৃত করোগেটেড ফাইবার বোর্ড বক্সের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রাফট পেপারের শ্রেণীবিভাগ ও প্যাকেজিং পণ্যের আন্তর্জাতিক গুণগত মান ধরে রাখার বিভিন্ন টেকনিক্যাল দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

অন্য প্রশিক্ষক শ্রীলংকার পলিপ্যাক সেকো লিমিটেডের হেড অব ইঞ্জিনিয়ার এবং প্লাস্টিক প্রসেসিং ও উৎপাদন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ প্রসাদ লাসাচ্ছা কুরুকুলারাত্চি প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক উপাদান সম্পর্কে ধারণা দেন। পাশাপাশি এগুলো প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে কোন কোন টেকনিক্যাল নির্দেশক বা গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার খেয়াল রাখতে হয়, সে বিষয়ে আলোচনা করেন।