ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন নিয়ে নানা শঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তুলনামূলক কম সহিংসতার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোট গ্রহণ। নির্বাচন চলাকালে কোথাও কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। হয়নি মব সন্ত্রাসের মতো কোনো ঘটনাও। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল ও পেশাদার আচরণের কারণেই এমন কম সহিংসতার মধ্য দিয়ে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ভোটারসহ সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এ নির্বাচন নিয়ে ভোটারের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। এছাড়া দীর্ঘ ১৭ বছর ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত থাকায় ভোট দেয়ার জন্য সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। অনেক কেন্দ্রেই ভোটারের দীর্ঘ লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন কেন্দ্রে নারী ও তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকার পাশাপাশি সব প্রার্থীর মধ্যেই জয়ের সম্ভাবনা থাকাই নির্বাচনের সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা কম হয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কিছু বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা বাদ দিলে মোটাদাগে নির্বাচনটি সুষ্ঠু হয়েছে। নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জগুলো ছিল, সেগুলো খুব বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। মূলত সেনাবাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীল আচরণের ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। এবারের নির্বাচন গণতান্ত্রিক অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। ছোটখাটো ত্রুটি, সংঘাত-সহিংসতা বা জাল ভোটের ঘটনা ঘটেছে। তবে এবারের নির্বাচনে যে বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা দেখছি, তার মধ্যে একটি বিষয় খুবই লক্ষণীয়। উভয় দলই মনে করছে তারা সরকার গঠন করবে, মানুষ তাদের সমর্থন দেবে। এ প্রবণতাও কিন্তু সংঘাত-সহিংসতা থেকে সবাইকে দূরে রাখার বড় একটি কারণ।’

ড. তৌহিদুল হক আরো বলেন, ‘একটা জায়গায় এখনো শঙ্কা রয়েছে, সেটা হচ্ছে ফলাফল ঘোষণার পর যারা হেরে যাবেন, তারা কীভাবে সেটিকে মূল্যায়ন করবেন। এখানেও গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে পারলে সংঘাত-সহিংসতা এড়িয়ে চলা সম্ভব হবে। ফলাফল যেটাই আসুক, এটা জনগণের রায়। এটা মেনে নিয়ে সবাই মিলে একসঙ্গে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।’

এদিকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন ছিল। নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার (উপকূলীয় ১৭ আসনে), বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৫০০, পুলিশ ও র‌্যাবের ১ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫২, আনসার ও ভিডিপির ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ এবং বিজিবি ও অন্যান্য মিলিয়ে ৪২ হাজার ৯৬০ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন।

পেশাদারত্ব ধরে রেখে দায়িত্ব পালন করার ফলেই ভোটে সংঘাত-সহিংসতা অতীতের তুলনায় অনেক কম হয়েছে বলে মনে করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের মানুষের বহুল কাঙ্ক্ষিত সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা ছিল। বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পেশাদারত্ব ধরে রেখে দায়িত্ব পালন করার কারণে প্রার্থীদের মধ্যেও কোনো অভিযোগ ছিল না। সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আশা করব রাজনৈতিক নেতারা ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে যেমন সহযোগিতা করেছেন, ঠিক তেমনই ফলাফলটাকে মেনে নিতে হবে। কারণ এটা জনগণের রায়।’