বাংলাদেশে ওষুধের মূল্যনির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক আবারো সামনে এসেছে। ওষুধের দাম কতটা সাশ্রয়ী হবে, বাজারের প্রতিযোগিতা কীভাবে কার্যকর রাখা যায় এবং মূল্যনিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা কতটা থাকা উচিত এসব প্রশ্নে অর্থনীতিবিদ, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, আইন বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

শুক্রবার (২২ আগস্ট) পিপিআরসির আয়োজিত ‘আজকের অ্যাজেন্ডা’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এ বিষয়ে আলোচনা হয়।

আলোচনায় উঠে আসে, দেশে ওষুধের দাম আন্তর্জাতিক তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও রোগীর নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমছে না। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে দেয়ার জন্য বিপুল অর্থের ওষুধ সরবরাহ করা হলেও বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ওষুধের মূল্য সমন্বয়ের দায়িত্ব স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিবর্তে সরকার-পরিচালিত কমিটির হাতে থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত দাম সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। জনরোষের আশঙ্কায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত আটকে থাকে।

তিনি আরো বলেন, ওষুধের মূল্য নির্ধারণে এমন একটি স্বচ্ছ ও স্বাধীন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে বাজারের বাস্তবতা, উৎপাদন ব্যয় এবং রোগীর সামর্থ্য তিনটিকেই বিবেচনায় নেয়া হবে। একই সঙ্গে জেনেরিক ওষুধের পাশাপাশি বায়োলজিক ওষুধ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াতে গবেষণা ও উন্নয়নে এখনই বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রুমানা হক বলেন, ২০২১-২২ অর্থবছরে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ৮৩০ কোটি টাকার ওষুধ সরবরাহ করেছিল। এরপরও বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ওষুধের ঘাটতি থাকায় রোগীদের নিজের অর্থে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ছে।

তার মতে, শুধু ওষুধের দাম কমানোই যথেষ্ট নয়। কোন ওষুধ প্রয়োজন, কোন রোগীর জন্য কতটুকু প্রয়োজন এবং প্রেসক্রিপশনে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ যুক্ত হচ্ছে কি না—এসব বিষয়েও নজরদারি বাড়াতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক ও ভিটামিনের অনুপযুক্ত এবং অতিরিক্ত ব্যবহার কমানোও জরুরি।

রেনাটা লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কায়সার কবির বলেন, স্থানীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশের ওষুধের দাম বৈশ্বিক তুলনায় এখনো কম। তার মতে, বাজারে সরাসরি মূল্য নিয়ন্ত্রণ সব ক্ষেত্রে কার্যকর নাও হতে পারে। বরং ক্যান্সারের মতো ব্যয়বহুল ও জটিল রোগের চিকিৎসায় সরকারকে লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ সংগ্রহ এবং ভর্তুকিযুক্ত বিতরণে গুরুত্ব দেয়া উচিত।

আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বর্তমান মূল্যনির্ধারণ ব্যবস্থার আইনি অস্পষ্টতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৮২ সালের ড্রাগ কন্ট্রোল অর্ডিন্যান্সে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের স্পষ্ট কর্তৃত্ব ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ড্রাগস অ্যান্ড কসমেটিকস আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সরকারের তদারকির পরিধি সংকুচিত হয়েছে। নির্দিষ্ট অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও সেই তালিকা এখনো প্রকাশ না হওয়ায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এছাড়া, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হুসাইন অবশ্য বিদ্যমান মূল্যনির্ধারণ কাঠামো পুরোপুরি বাতিলের বিপক্ষে। ২০২৬ সালের ওষুধ মূল্যনির্ধারণ নির্দেশিকায় সব অংশীজনের মতামত পুরোপুরি প্রতিফলিত না হলেও সেটিকে বাতিল না করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা উচিত।

সবশেষ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক হোসাইন বলেন, দীর্ঘদিন লোকসানের কারণে কিছু অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বাজার থেকে হারিয়ে গেছে। প্রশাসনিকভাবে দাম নির্ধারণের বদলে বাজার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এসব ওষুধের দাম নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে ওষুধের সহজলভ্যতা ও মান নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।