বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী শিল্পে গত এক দশকে নারী শ্রমিক কমার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। খাতটি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের কাঠামোগত চাপ তৈরি হয়েছে। রফতানিমুখী তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন উৎপাদনশিল্পে অটোমেশন, দক্ষতার ঘাটতি ও কর্মপরিবেশের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায় ১৮ লাখ নারী শ্রমিক কর্মক্ষেত্র থেকে সরে গেছেন। এ হার একসময় ছিল ৮০ শতাংশ পর্যন্ত, এখন তা নেমে এসেছে ৩৯ শতাংশে।

রোববার (৩০ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে র‍্যাপিড ও এফইএস বাংলাদেশের যৌথ গবেষণা উপস্থাপন অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে এ চিত্র তুলে ধরেন র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. সানওয়ার জাহান ভূঁইয়া। প্রধান অতিথি ছিলেন পিপিআরসি এর নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স তুনিয়ন।

গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উৎপাদনশিল্পে নারীকর্মীর সংখ্যা ৩৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি থেকে কমে প্রায় ২০ লাখে এসেছে। ফলে ১৮ লাখ নারী শ্রমিক শ্রমবাজার থেকে সরে গেছেন। এতে এই খাতে নারীদের অংশীদারিত্ব ৪০ শতাংশ থেকে কমে ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, গত এক দশকে শিল্পখাতের গড় উৎপাদন বৃদ্ধি ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে শিল্পখাতে মোট কর্মসংস্থান ৯৫ লাখ থেকে কমে ৮১ লাখে এসেছে, অর্থাৎ কমেছে ১৪ লাখ। এতে প্রবৃদ্ধি শ্রমনির্ভর না থেকে পুঁজি-নির্ভর ও অটোমেশন-ভিত্তিক হয়ে ওঠার বিষয়টি পরিষ্কার।

তৈরি পোশাক খাতে ২০১০ থেকে ২০২৩ সময়ে রফতানি ১২.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়তে বাড়তে ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু প্রায় ৪০ লাখ কর্মসংস্থান সেখানে স্থির রয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতি ১ মিলিয়ন ডলার রফতানিতে আগে ৫৪৫ জন শ্রমিক লাগত, এখন তা নেমে এসেছে ৯০ এর নিচে।

২০২৪ সালে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৩.৬৬ শতাংশ। এর বিপরীতে যুব বেকারত্বের হার দ্বিগুণেরও বেশি, প্রায় ৮.০৭ শতাংশ। এর মাধ্যমে দেখা যায়, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থান সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কৃষিখাতের জিডিপিতে অংশ প্রায় ১৫.৫ শতাংশ থেকে কমে ১১ শতাংশে নেমে এসেছে এবং শিল্পখাতের অংশ প্রায় ২৫ থেকে ৩৪ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে, মোট উৎপাদনের মাত্র প্রায় ১১ শতাংশ জিডিপি অবদান থাকার পরও কৃষি খাত এখনো মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষকে কাজে নিয়োজিত রেখেছে।

গেস্ট অব অনার ড. সায়েমা হক বিদিশা বলেন, উৎপাদনশীলতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ এবং বেসরকারি খাতের চাহিদার সঙ্গে দক্ষতার সঠিক সমন্বয় কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে। তিনি বলেন, লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা, গ্রামীণ বিনিয়োগ, শ্রমিক অধিকার সুরক্ষা ও ফ্রিল্যান্সিং সহায়তা তরুণদের বেকারত্ব কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ অতিথি মি. ম্যাক্স তুনিয়ন বলেন, শ্রম-কেন্দ্রিক নীতিতে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি শ্রম অধিকার জোরদার করা, আঞ্চলিক কর্মসংস্থান কৌশল সমন্বয়ের পদক্ষেপ নেয়া, শিশু যত্ন নীতিমালা উন্নত করা এবং মূল খাতগুলোতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন।

প্রধান অতিথি ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বিগত ১৫-২০ বছর প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য কমার সাফল্যে নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে আত্মতুষ্টি দেখা গেছে। তিনি বলেন, কর্মসংস্থান খাত উল্টো পথে হাঁটছে, কারণ উৎপাদন বাড়লেও চাকরি কমছে। কৃষিখাতে ৪৫ শতাংশ শ্রমিক কাজ করলেও জিডিপিতে অবদান মাত্র ১১ শতাংশ। আর এ অবস্থাকে তিনি কাঠামোগত দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি তরুণ ও নারীদের জন্য শ্রম-কেন্দ্রিক নীতি গ্রহণ ও কর্মসংস্থান কৌশল উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।