দেশের প্রধান বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। সমুদ্র তীরবর্তী, একাধিক নদী ও পাহাড়বেষ্টিত হওয়া সত্ত্বেও এ শহরে জলজট যেন নিত্য ঘটনা। জলাবদ্ধতা নিরসনে ৬-১০ বছর আগে নেয়া হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার চার প্রকল্প। তবে কাজের ধীরগতি ও দীর্ঘসূত্রতায় কোনো সুফলই পায়নি চট্টগ্রামবাসী। উল্টো সেই ব্যয় বেড়ে ১৪ হাজার ২৬৩ কোটি টাকায় উঠেছে। পাশাপাশি আগে যেখানে বৃষ্টি হলে জমত হাঁটুজল, এখন কোমর; কোথাও কোথাও আবার জমছে বুকসমান পানি। নগরীর প্রধান এ সংকটের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) একে অপরকে দোষারোপ করে আসছে। সংস্থা দুটির মধ্যে সমন্বয় না থাকায় একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও জটিলতায় পড়েছে বাস্তবায়নকারী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।  

কয়েক দিনের টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর অধিকাংশ এলাকাই বুকসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। খাতুনগঞ্জ, রিয়াজউদ্দিন বাজার, পাহাড়তলী বাজার ছাড়াও নগরীর প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো প্রতিদিন বড় একটি সময় পানির নিচে থাকছে। অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষ পড়ছে বিপাকে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়াও মানুষের স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যও থমকে রয়েছে কয়েকদিন ধরে। 

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে সিডিএ। ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পটি ২০১৭ সালের আগস্টে একনেকে অনুমোদন হয়। ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকার এ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। তিন দফায় সময় বাড়িয়ে সেটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব দিয়েছে সিডিএ। এরই মধ্যে ব্যয় বেড়ে সর্বশেষ সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত ডিপিপি প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। সর্বশেষ মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ ৭৭ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। তবে এ প্রকল্পের অধীনে নগরীর প্রধান প্রধান বেশ কয়েকটি সড়ক উঁচু করা হলেও অলিগলিসহ বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় সংকট এখন চরমে।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের বড় বাধা ছিল ভূমি অধিগ্রহণ। সেই জটিলতায় নগরীর মির্জাখাল, ত্রিপুরাখাল, গয়নাছড়া খাল, ডোমখালী খাল, মহেশখাল, চাক্তাইখাল, চাক্তাই ডাইমেনশন খাল, হিজড়া খাল, বদরখাল, নোয়াখাল, শিতলঝর্ণা খাল, চশমাখালসহ ১৮টি খালের খনন, সম্প্রসারণ ও সংস্কার নিয়ে সময়ক্ষেপণ হয়। সিডিএকে এ প্রকল্পের জন্য ৬ হাজার ৫১৬ কাঠা ভূমি অধিগ্রহণ করতে হচ্ছে। বর্তমানে খালের পাড়ের মোট ৮৫ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার সড়কের এক-পঞ্চমাংশ কাজ শেষ করতে পেরেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। পাহাড় বিধৌত বালি আটকানোর ৪২টি সিলট্র্যাপ স্থাপনের এক-তৃতীয়াংশের কাজ শুরু হয়েছে। 

জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ‘কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ’। ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল একনেকে পাস হলেও কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর থেকে। ২ হাজার ৩১০ কোটি ২৪ লাখ টাকার প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের সর্ববৃহৎ ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চাক্তাই, খাতুনগঞ্জসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ১২টি খালের মুখে রেগুলেটর ও পাম্প হাউজ স্থাপন। তিন দফায় সময় বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। গত মার্চ পর্যন্ত ৬৭ শতাংশ ভৌত অগ্রগতি হলেও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। 

চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতার জন্য চসিকের কোনো দায় নেই—সবসময়ই এমন কথা শোনা যায় মেয়র কিংবা সংস্থাটির দায়িত্বশীলদের মুখে। যদিও জলাবদ্ধতা নিরসনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে পুরনো (২০১৪ সালে হাতে নেয়া) প্রকল্পটির আওতায় তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বারইপাড়া খাল খননের কাজ এখনো শেষ করতে পারেনি চসিক। মাত্র ৩২৬ কোটি টাকার সেই প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা ছাড়ালেও কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ। তবে এ ব্যর্থতার দায় এককভাবে নিতে রাজি নয় তারা। বরং জলাবদ্ধতা নিরসনসংক্রান্ত জটিলতায় তারা সিডিএকে দায়ী করে আসছে। আর চসিক মেয়র দায়ী করছেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী অন্য সংস্থাগুলোর কাজের গাফিলতিকে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চসিক মেয়র এম রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতার জন্য মানুষ সিটি করপোরেশনকে দায়ী করছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের কোনো ভূমিকা নেই। আমরা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি ব্যর্থ হয়েছে।’ জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়ে চসিককে দায়ী করা সমীচীন নয় বলে মনে করছেন মেয়র। 

জলাবদ্ধতা নিরসনে আরেকটি মেগা প্রকল্প হচ্ছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো)। সেনাবাহিনীর অধীনে বাস্তবায়নাধীন ১ হাজার ৬২০ কোটি ৭৩ লাখ টাকার প্রকল্পটি ২০১৮ সালে শুরু হয়ে ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময় বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হলেও ৬ দশমিক ৬ মিটার উচ্চতায় ২১ কিলোমিটার ফ্লাড ওয়াল বা রিটেইনিং ওয়াল এবং ২৩টি খালের মুখে রেগুলেটর নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পের ভৌগ অগ্রগতি এক-চতুর্থাংশ শেষ হলেও সরকারি বিভিন্ন সংস্থার আপত্তি আর ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় রয়েছে। 

এ-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিদ্যমান চারটি প্রকল্পের জন্য সরকার ব্যয় করছে ১১ হাজার ৩৭৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। যদিও সবচেয়ে বড় সিডিএর জলাবদ্ধতা প্রকল্পের মেয়াদের পাশাপাশি ব্যয় প্রায় ২ হাজার ৮৮৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা বাড়িয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এটি অনুমোদন পেলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সর্বমোট ১৪ হাজার ২৬২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে। যদিও প্রকল্পগুলোর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় এক দশকের বেশি সময় ব্যয় হলেও এখনো মানুষ দৃশ্যমান কোনো সুফল পায়নি। 

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনেও চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি উঠে আসে। চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী। জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের তিন-চতুর্থাংশের বেশি কাজ আমরা করে ফেলেছি। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণজনিত জটিলতায় অন্তত ১০টি খালের কোনো কাজই শুরু করা যায়নি। তাই সময় ও ব্যয় বাড়ানোর একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি পাস হয়ে এলেই কেবল কবে নাগাদ কাজ শেষ করা যাবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেয়া যাবে।’ তবে যে পরিমাণ অর্থ ছাড় হয়েছে সে অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। 

সিডিএ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেগা একটি প্রকল্পের কাজ শেষপর্যায়ে আসার পরও প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ হয়নি। চলতি বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদও শেষ হয়েছে। ফলে নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণসহ ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব ও সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। মূল ডিপিপির নির্ধারিত অর্থের এরই মধ্যে ৩ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। ফলে বাকি অর্থ ছাড় ও বাড়তি অর্থ ছাড়ের জন্য সরকার যে সময় নেবে সে অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।