‘সুস্বাস্থ্য উন্নয়নের হাতিয়ার’—এ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ২০১১ সালে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আর ২০১২ সালের মার্চে জাতীয় সংসদে সেটি উপস্থাপন করা হয়। সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও জরুরি চিকিৎসাসেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমতার ভিত্তিতে সেবাগ্রহীতাকেন্দ্রিক মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সহজপ্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং বিস্তারের লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে প্রণীত এ স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নের সময়সীমা হিসেবে বেছে নেয়া হয় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর ২০২১ সালকে।

জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে সংক্রামক ব্যাধি এবং নতুন রোগের আবির্ভাব ও পুনরাবির্ভাব মোকাবেলায় নার্স ও টেকনোলজিস্ট তথা জনবল নিয়োগের বিষয়ে বেশকিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। এ স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নের সময় হাতে আছে আর এক বছর। এর মধ্যে দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এতে উল্লিখিত চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্টসহ স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ মানবসম্পদ বৃদ্ধিসহ অনেক লক্ষ্য বাস্তবায়ন এখনো অধরাই রয়ে গিয়েছে।

স্বাস্থ্যনীতিতে বলা হয়েছিল, জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ অজ্ঞ ও অদক্ষ লোকের সেবা নিতে বাধ্য হচ্ছে। দক্ষ মানবসম্পদ এবং বিশেষত নার্স ও প্রযুক্তিবিদের (টেকনোলজিস্ট) সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এজন্য স্বাস্থ্য কর্মীদের পেশাগত দক্ষতা ও মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ের নতুন পদ্ধতি এবং প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত আবিষ্কার হচ্ছে, যা উন্নত দেশগুলোয় প্রয়োগ করা হচ্ছে, আমাদের দেশেও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে জটিল রোগের চিকিৎসায় নিয়োজিত বিশেষজ্ঞদের নতুন প্রযুক্তির জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের ব্যবস্থা রাখা দরকার।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, খাতটিতে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, ওয়ার্ডবয়, নিরাপত্তা কর্মী, ড্রাইভার, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, আয়াসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর ৩০ হাজার পদ শূন্য পড়ে আছে। আইনি জটিলতার কারণে বছরের পর বছর ধরে এসব পদে নিয়োগ দেয়া যাচ্ছিল না। বছর দেড়েক আগে সে বাধা দূর হলেও এখনো তাদের নিয়োগ দেয়া যায়নি। সরকারি চিকিৎসক পদেরও একটি বড় অংশ খালি। এখন তড়িঘড়ি করে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিয়োগ দ্রুত করতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেও জনবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান খান বলেন, মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অনেক পদ খালি আছে। এখন সেসব পদে প্রচলিত নিয়োগবিধি মেনে নিয়োগ দিতে চাইলে সময় প্রয়োজন। এখনকার প্রেক্ষাপটে সেটি সম্ভব নয়। সেজন্যই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে। সেটি পাওয়া গেছে। খুব শিগগিরই এসব পদে জনবল নিয়োগের মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসার প্রয়োজনীয় উপকরণ ও লোকবল নিশ্চিত করা এবং ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে সেবার গুণগত মান বৃদ্ধিকে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সেবার মান নিশ্চিত করা এবং সেবা ও শিক্ষার ব্যয় জনসাধারণের মধ্যে রাখার বিষয়টিও এতে উঠে এসেছে। এছাড়াও নার্সিং, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও স্বাস্থ্যসেবা সহায়কসহ সব ধরনের চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন ও দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী যুগোপযোগী করার কথাও বলা হয়েছে জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিতে।

স্বাস্থ্যনীতির এসব লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে চলমান কভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাব। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি সার্বজনীন স্বাস্থ্যনীতি থাকার পরও সে অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় নীতিটি কাগুজে নীতিতে পরিণত হয়েছে। এমনকি এ স্বাস্থ্যনীতির আওতায় সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে জাতীয় স্বাস্থ্য কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বেসরকারি খাতের স্টেকহোল্ডার ও বিশেজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে এ কাউন্সিল গঠন করা হয়। কাউন্সিলকে গণ্য করা হয় স্বাস্থ্য খাতের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা হিসেবে। প্রধানমন্ত্রীও কাউন্সিলের একাধিক সভায় সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ অন্যান্য বিষয়ে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছেন, যা কাউন্সিলের বিভিন্ন সভার কার্যবিবরণীতেও উঠে এসেছে, যদিও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫(ক) এবং ১৮(১)-এ চিকিৎসাসেবা এবং জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ কভিড-১৯ মহামারীর এ দুর্যোগের সময় জনগণের সে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকারটি বার বার উপেক্ষিত হয়েছে জনবল ও অবকাঠামো সংকটের কারণে।

২০১১ সালে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের সময়ই এটি বাস্তবায়নের কিছু চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়। সেসবের মধ্যে ছিল সেবা সরবরাহের ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও সেবার দুর্বল গুণগত মান। অন্যদিকে সেবাগ্রহীতাদের দিক থেকে সার্বিকভাবে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সামর্থ্যের অভাব ও স্বাস্থ্যবিধিভিত্তিক জীবনযাপন না করা। গত নয় বছরে এসব চ্যালেঞ্জের কোনো সমাধান হয়নি, বরং তা কিছু ক্ষেত্রে আরো বেড়েছে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, দায়বদ্ধতা না থাকায় স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে যে নীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেটি এক অর্থে কাগুজে নীতিতে পরিণত হয়েছে। এ কভিড-১৯ দুর্যোগ সেটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এ নীতি বাস্তবায়িত হলে জনগণ তার সুফল পেত।