রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। অথচ খোদ নগর ভবনের ভেতরেই প্রতিদিন দেখা যায় অটোরিকশার জটলা। যাত্রী নিয়ে নির্বিঘ্নে এসব অনুমোদনহীন যান নগর ভবনে ঢুকছে ও বের হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ভবনটির বিপরীত পাশে ওসমানী উদ্যানসংলগ্ন ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে অনেকগুলো মোবাইলের দোকান। কোনো কাগজপত্র ছাড়াই সেখানে মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন সরঞ্জাম বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
নগরসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নিজেদের কার্যালয়সংলগ্ন এলাকাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারা ডিএসসিসির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। নগর ভবনের সামনে অটোরিকশার অবাধ চলাচল এবং ফুটপাতজুড়ে দোকানপাটের বিস্তারকে তারা সিটি করপোরেশনের হকার উচ্ছেদ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার কার্যক্রমের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মনে করছেন।
নগর ভবনে গতকাল দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, মূল ফটকের সামনে অন্তত ১৫-২০টি অটোরিকশা জড়ো হয়ে রয়েছে। কিছু রিকশা আবার নগর ভবন থেকে যাত্রী নিয়ে বের হচ্ছে। কয়েকটি যাত্রী নিয়ে সরাসরি ভেতরে প্রবেশ করছে।
বিষয়টি নিয়ে নগর ভবনের কর্মকর্তারাও বিব্রত বলে জানান। তাদের ভাষ্য, অটোরিকশার জটলার কারণে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল নিয়ে নগর ভবন থেকে বের হওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশাসকের গাড়ি প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় নিরাপত্তাপ্রহরীরা কিছুটা তৎপর হলেও পরে আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে।
নগর ভবনের দুই নিরাপত্তাপ্রহরীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অটোরিকশা প্রবেশে বাধা দেয়ার বিষয়ে তাদেরকে কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। যাত্রী থাকলে অটোরিকশা নগর ভবনের ভেতরে ঢুকতে পারে এবং যাত্রী নিয়ে বের হয়ে যায়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান এ কার্যালয়ের বিপরীত পাশে ওসমানী উদ্যানসংলগ্ন ফুটপাতের চিত্রও ভিন্ন নয়। সরেজমিনে সেখানে শতাধিক মোবাইলের দোকান দেখা যায়। এসব দোকানে কাগজপত্র ছাড়াই মোবাইল ফোন, চার্জারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে কয়েকটি চায়ের স্টলও।
হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় দুই বছর ধরে তারা সেখানে ব্যবসা করছেন। আগে দোকানের পরিধি আরো বড় ছিল। বর্তমানে ওসমানী উদ্যানের সীমানাপ্রাচীর মেরামতের কাজ চলায় কিছু দোকান তারা নিজরাই সরিয়ে নিয়েছেন।
ইসমাইল কাদের নামে এক হকার দাবি করেন, নগর ভবনের ভেতরের লোকজন, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের ‘সন্তুষ্ট’ করেই তারা সেখানে ব্যবসা করেন। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কখন উচ্ছেদ অভিযান হবে এবং সে সময় তাদের মালামাল কোথায় রাখতে হবে, সে বিষয়েও আগাম নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কারো নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি।
নগর ভবনের সামনের এ পরিস্থিতিকে ডিএসসিসির ফুটপাত দখলমুক্ত করার কার্যক্রমের বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কথায় আছে, প্রদীপের নিচে অন্ধকার। নগরসেবা কোন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো নগর ভবনের ভেতরে অটোরিকশার জটলা আর সামনের ফুটপাত দখল করে চোরাই মোবাইলের মার্কেট। এর অর্থ হচ্ছে, হকার উচ্ছেদ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং অটোর দৌরাত্ম্য কমানোর কোনো সদিচ্ছাই নগর প্রশাসনের নেই। তাদের একটাই ইচ্ছা—হকার বসাও, ভাগ-বাটোয়ারা করো।’
রাজধানীতে অটোরিকশার দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ ও হকার উচ্ছেদ করে ফুটপাত দখলমুক্ত করার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি ও আন্দোলন করে আসছেন সোহানী শিফা। নগর ভবনের ভেতরে অটোরিকশার চলাচল নিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে কখনো দেখিনি যে একেবারে নগর ভবনের ভেতরে অটোরিকশা চলে যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখি, অটোরিকশায় পুরো নগর ভবনের গেট ব্লক হয়ে আছে। আবার বিপরীত পাশের ফুটপাত দখল করে রেখেছেন হকাররা। বর্তমান প্রশাসক যদি নিজের কার্যালয়ই অটো ও হকারমুক্ত রাখতে না পারেন, তাহলে পুরো ঢাকাকে কীভাবে নাগরিকবান্ধব করে তুলবেন?’
নগর ভবনের সামনের ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা মোবাইল মার্কেটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসির সম্পত্তি কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হাছিবা খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছি। গত সপ্তাহে দুইদিন আমি নিজে উচ্ছেদ করেছি। ছোট্ট ভ্যানে অল্প টাকার কিছু সামগ্রী নিয়ে তারা বসে। জরিমানা করলেও আবার ফিরে আসে।’
ডিএসসিসির সামনের ফুটপাতই হকারমুক্ত রাখা না গেলে অন্যান্য এলাকায় কীভাবে তা সম্ভব হবে—এ প্রশ্নের জবাবে হাছিবা খান বলেন, ‘আমরা একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা করছি। প্রকৃত হকারদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তালিকা প্রস্তুত হলে ফাইনাল ড্রাইভ দেব। আশা করি পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হবে।’










