সাম্প্রতিককালে দেশে যতগুলো বড় ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার সবই হয়েছে ঢাকা-সিলেট রেলপথের আখাউড়া-সিলেট অংশে। সংস্কারের অভাবে জীর্ণ দশায় চলে যাওয়া রেলপথটিতে কিছুদিন পর পরই লাইনচ্যুত হচ্ছে ট্রেন। রয়েছে রেলকর্মীদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও। নভেম্বরে চারদিনের ব্যবধানে দুটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছিল। এর রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল হবিগঞ্জের মাধবপুরে ফের লাইনচ্যুত হয় একটি তেলবাহী ট্রেন। এ ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা করছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

২০১৯ সালে এ রেলপথে দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২১ যাত্রী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছিল নভেম্বরে। ওই ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। আহতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যায়। দুর্ঘটনায় দুমড়ে-মুচড়ে যায় ট্রেন দুটির বগি-ইঞ্জিন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় রেলপথ। এর আগে ২০১৯ সালের ২৩ জুন, অর্থাৎ কসবার দুর্ঘটনার পাঁচ মাস আগে সেতু ভেঙে লাইনচ্যুত হয়ে পানিতে পড়ে যায় উপবন এক্সপ্রেসের একটি বগি। চারজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ওই দুর্ঘটনায় আহত হন অন্তত ৬৪ যাত্রী।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় প্রতি মাসেই ঢাকা-সিলেট রেলপথের আখাউড়া-সিলেট অংশে এক বা একাধিক দুর্ঘটনা ঘটছে, এর বেশির ভাগই লাইনচ্যুতির ঘটনা। এর মধ্যে ২০১৯ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু লাইনচ্যুতির ঘটনাই ঘটেছে নয়টি। ওই বছরের ১৬ মে ফেঞ্চুগঞ্জে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন, ২ জুন শায়েস্তাগঞ্জে কুশিয়ারা এক্সপ্রেস, ২০ জুলাই একই স্থানে কালনী এক্সপ্রেস, ১৯ জুলাই কুলাউড়ায় জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, ৪ সেপ্টেম্বর ও ১৬ আগস্ট একই এলাকায় উপবন এক্সপ্রেস, ১৭ সেপ্টেম্বর ফেঞ্চুগঞ্জে জালালাবাদ এক্সপ্রেস, ৪ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জালালাবাদ এক্সপ্রেস, ২৯ ডিসেম্বর কুলাউড়ার বরমচালে একটি মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। এছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষ ও সেতু ভেঙে বগি পানিতে পড়ে যাওয়ার পাশাপাশি একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও রয়েছে।

হবিগঞ্জের মাধবপুরে গতকাল যে তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে, তাতে রেলকর্মীদের দায়িত্বে অবহেলার মতো বিষয় থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার সাহাদাত আলী, যিনি এর আগে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন। গতকালের ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, যে স্থানে ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে, সেখানে রেলপথ সংস্কারের কাজ চলছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি। সংস্কারের জন্য সেখানে কিছু রেলপথ তুলে ফেলা হয়েছিল। নিয়ম হলো কোথাও লাইনের কাজ হলে তার দুপাশেই রেড সিগন্যাল থাকবে। দুই প্রান্তের স্টেশন মাস্টারকে অবহিত করে সংশ্লিষ্ট এ কাজটি করবেন। কাজ চলাকালে সেখান দিয়ে কীভাবে তেলবাহী ট্রেনটি গেল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

দেশের অন্যান্য রেলপথের চেয়ে ঢাকা-সিলেট রেলপথের আখাউড়া-সিলেট অংশে দুর্ঘটনার হার তুলনামূলক বেশি। এর কারণ জানতে চাইলে সরদার সাহাদাত আলী বলেন, পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এই সেকশনটির অনেক স্থানে একটা ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চালানো সম্ভব হয় না। প্রয়োজন হলে ট্রেনের পেছনে আরো একটি ইঞ্জিন জুড়ে দিয়ে ট্রেন টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। এটা করতে গিয়ে অনেক সময় ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। তখন লাইনচ্যুতিসহ ট্রেন দুর্ঘটনার শঙ্কা বেড়ে যায়।

তবে শুধুই ভূ-প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা নয়, সুষ্ঠুভাবে ট্রেন পরিচালনার জন্য আখাউড়া-সিলেট রেলপথে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি বলে উঠে এসেছিল কুলাউড়ায় উপবন এক্সপ্রেসে দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে। তদন্তে দেখা গেছে, ‘ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল এবং জেনারেল অ্যান্ড সাবসিডিয়ারি রুল’ অনুযায়ী রেলপথটি সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হন রেলকর্মীরা। দুর্ঘটনার জন্য ‘রেলপথ যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়া’কে দায়ী করা হয় ওই প্রতিবেদনে।

রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন জানিয়েছেন, আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত রেলপথটি বেশ পুরনো। রেলপথটি সংস্কার করে বিদ্যমান মিটার গেজ রেললাইনকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর করার জন্য একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। নতুন করে রেলপথটি বানানো হলে ঢাকা-সিলেট রুটের যাত্রীরা উন্নত ও নিরাপদ রেলসেবা পাবেন বলে জানান মন্ত্রী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছর সারা দেশ সব মিলিয়ে ৯১টি ট্রেন দুর্ঘটনা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি ছিল মুখোমুখি দুর্ঘটনা। লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছিল ৭৮টি। অন্যদিকে ২০১৯ সালে সব মিলিয়ে ১২৯টি ট্রেন দুর্ঘটনা হয়। এসব দুর্ঘটনায় ৩৯ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি আহত হন দেড় শতাধিক যাত্রী।