নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তাল রয়েছে সাগর। এ অবস্থায় উপকূলবর্তী চার নদীবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেয়া হয়েছে। নিম্নচাপের প্রভাবে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের সব নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে উপকূলবর্তী নিম্নাঞ্চল। নদী ও সাগর উত্তাল থাকায় নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সঙ্গে সারা দেশের নৌ চলাচল বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিনে নৌযান চলাচলও বন্ধ রাখা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বেলা ৩টার পর বরিশাল নগরীর প্রধান সড়ক সদর রোডসহ অনেক এলাকায় কীর্তনখোলার জোয়ারের পানি ঢুকে পড়েছে। ভাটিখানা, পলাশপুর, সাগরদী ধান গবেষণা রোড, জিয়ানগর এলাকায় অনেক বাড়িতে প্রায় হাঁটুসমান পানি উঠেছে।
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপপ্রকৌশলী তাইজুল ইসলাম জানান, গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে কীর্তনখোলা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার, বাকেরগঞ্জে বুড়িশ্বরের পানি ৯, হিজলার ধর্মগঞ্জ নদীর পানি ৭৭, ঝালকাঠীর বিষখালী নদীর পানি ২৬, বরগুনার বিষখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ৫২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া মেঘনা নদীর পানি ভোলার দৌলতখান পয়েন্টে বিপৎসীমার ৮২ সেন্টিমিটার, তজুমদ্দিন পয়েন্টে ১৪৫, ভোলা খেয়াঘাটসংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বরগুনায় বিষখালী নদীর পানি ৩১, একই নদীর পানি পাথরঘাটায় ৪৫ সেন্টিমিটার প্রবাহিত হচ্ছে। পটুয়াখালীর কাইতপাড়ার লোহালিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার, মির্জাগঞ্জে বুড়িশ্বর নদীর পানি ২৯ সেন্টিমিটার, একই নদীর পানি বরগুনার আমতলী পয়েন্টে ১৮ সেন্টিমিটার ও উমেদপুরে কচা নদীর পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বরিশাল আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র পর্যবেক্ষক মিলন হাওলাদার জানান, বেলা ৩টায় তারা বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০ কিলোমিটার রেকর্ড করেছেন। এটাই ছিল দিনের সর্বোচ্চ গতিবেগ। বেলা ৩টা থেকে আগের ২৪ ঘণ্টায় ২১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
পটুয়াখালীর বিভিন্ন নদ-নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে তিন-চার ফুট পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ফসলের খেত ও মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। নিম্নচাপের প্রভাবে কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী, মির্জাগঞ্জ ও গলাচিপা উপজেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। দুই দফা জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে বেড়িবাঁধের বাইরের নিম্নাঞ্চল। ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশ করে তলিয়ে গেছে রাঙ্গাবালী উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রাম। মাছধরা ট্রলারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন।
নিম্নচাপের প্রভাবে গতকাল বেলা ১১টার পর থেকে নোয়াখালীর মেঘনা নদী উত্তাল রয়েছে। জোয়ারের পানি স্বাভাবিক সময় থেকে এক-দুই ফুট অধিক উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। নদী উত্তাল থাকায় দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সঙ্গে সারা দেশের নৌ চলাচল বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। মাছ ধরার নৌকাগুলো দুপুরের পর থেকে নদীর পারে ভিড়তে শুরু করেছে। সকালে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেয়ার পর পরই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বিভিন্ন ঘাটে ফোন করে যাত্রী পারাপার বন্ধ রাখার এ আদেশ দেন। এরপর থেকে হাতিয়ার নলচিরা-চেয়ারম্যান ঘাট নৌপথে চলাচলকারী সি-ট্রাক ও বেসরকারি বিভিন্ন যানবাহনে যাত্রী পারাপার বন্ধ রাখা হয়েছে।
এছাড়া দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে বন্ধ রয়েছে ঢাকা-হাতিয়া রুটে যাত্রীবাহী লাইটার জাহাজ চলাচল। একইভাবে চট্টগ্রাম-হাতিয়া রুটে চলাচলকারী সরকারি জাহাজগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে।
জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা লঞ্চঘাট, ফেরিঘাটসহ এর আশপাশের এলাকা। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে চার-পাঁচ ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিসির ভোলার ইলিশা ঘাটের ব্যবস্থাপক কাওসার হোসেন বলেন, ‘ফেরিঘাটটি বেড়িবাঁধের ঢালে হওয়ায় এখানে মাটি, ইট, সুরকি, বালি রাখা যায় না। প্লাবনের হাত থেকে রক্ষা পেতে বহুবার ইট, সুরকি ফেলা হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই একই অবস্থা তৈরি হয়। এর পরও বর্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে নতুন করে জায়গাটি উঁচু করা হবে।’
মেঘনা নদীর জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ছে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে পানির উচ্চতা বেড়েছে। গতকাল সকাল থেকে জোয়ারের পানি উপকূলে ঢুকতে শুরু করে। এতে মেঘনাসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, ফসলি জমি। প্রচণ্ড বাতাসে মানুষের বসতবাড়ির গাছপালা ভেঙে পড়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, মেঘনার জোয়ারের পানি প্রবেশ করে কমলনগর উপজেলার মতিরহাট বাজার, মুন্সিরগঞ্জ বাজার, সাহেবেরহাট, নাজিরগঞ্জ, নবীগঞ্জ, কাদির পণ্ডিতের হাট, পাটারীরহাট ও রামগতি উপজেলার বিবিরহাট ওছখালী, চরগাজী ও বড়খেরী ইউনিয়নের হাটবাজার ও রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে আমনের বীজতলা। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ।
লক্ষ্মীপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ্জামান খান বলেন, ‘মেঘনার তীর রক্ষা বাঁধের কার্যক্রম চলমান। গতকাল সকাল থেকে মেঘনায় অতিরিক্ত জোয়ার হচ্ছে। জোয়ারের পানি তীরবর্তী এলাকায় ঢুকে পড়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে নদী স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তখন পানি নেমে পড়বে।’
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তাল রয়েছে কক্সবাজার সমুদ্র উপকূল। গতকাল সাগরে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে চার-পাঁচ ফুট উচ্চতায় তীরে আছড়ে পড়েছে। পর্যটকদের সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
সকাল থেকে কক্সবাজার সমুদ্র উপকূল ও আশপাশের এলাকায় দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল। সারা দিন আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। একই সঙ্গে হালকা ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি অব্যাহত ছিল।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, কক্সবাজারসহ দেশের চার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। নিম্নচাপের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে।
সাগর উত্তাল থাকায় টেকনাফের সঙ্গে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের নৌ চলাচল বন্ধ রাখতে বলেছে উপজেলা প্রশাসন। মহেশখালী ও কুতুবদিয়া দ্বীপের সঙ্গে নৌ চলাচলে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আবহাওয়া অফিস বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলেছে।
আবহাওয়ার বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অমাবস্যা ও নিম্নচাপের প্রভাবে কক্সবাজারসহ উপকূলীয় জেলা এক-তিন ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। এছাড়া আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রামসহ তিন বিভাগে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। আগামী দুইদিন এ পরিস্থিতি থাকতে পারে। এ সময়ে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড় ধসের আশঙ্কাও রয়েছে।










