বাগেরহাটের প্রায় ১৭ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার কেন্দ্রস্থল ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। ২০১৩ সালে ১০০ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয় এটি। অর্ধেকেরও কম চিকিৎসক ও জনবল দিয়ে চলছে এর চিকিৎসা কার্যক্রম। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা না থাকায় সেবাবঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা। জীবন বাঁচাতে অনেক সময় বাধ্য হয়ে রোগীকে যেতে হচ্ছে খুলনা ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে। এতে একদিকে যেমন তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে দাবি সেবা নিতে আসা রোগীর।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এর বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৮০০-১০০০ রোগী চিকিৎসা নেয়। ২৫০ শয্যার বিপরীতে ৩৫০-৫০০ রোগী ভর্তি থাকে নিয়মিত। বিপুলসংখ্যক রোগীর জন্য ৫৬টি চিকিৎসকের পদ বরাদ্দ থাকলেও শূন্য রয়েছে ৩০টি। এর মধ্যে সহকারী পরিচালক, কনসালট্যান্ট চক্ষু, অ্যানেস্থেসিয়া, সার্জারি, কার্ডিওলজির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদও রয়েছে ফাঁকা। এছাড়া নার্সের ১০৯টি পদের মধ্যে ২৮টি পদ শূন্য এবং দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর ৪৪টি পদ শূন্য রয়েছে। এতে রোগীকে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসক ও নার্সকে। প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কাজেও রয়েছে বিড়ম্বনা।
বুকে ব্যথাসহ শারীরিক কিছু অসুবিধা নিয়ে বৃহস্পতিবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন শরণখোলা উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামের শাহনুর বেগম। শয্যা না পেয়ে মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তার। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি থেকেও, বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে হতদরিদ্র এই নারীকে।
কচুয়ার হাজরাখালী গ্রামের রবিউল ইসলাম বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলাম। তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখন খুলনায় নিয়ে যেতে বলেছেন চিকিৎসকরা।’
মোরেলগঞ্জ উপজেলার ফুলহাতা থেকে আসা নুরুল আমিন বলেন, ‘এখানকার চিকিৎসকরা আন্তরিক। কিন্তু রক্তের পরীক্ষা করা লাগে বাইরে থেকে। এজন্য আমাদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে।’
বহির্বিভাগে অপেক্ষারত ষাটোর্ধ্ব আবছার মোল্লা বলেন, ‘চোখের ডাক্তার দেখাতে এসেছিলাম। শুনলাম চোখের ডাক্তার নেই। পরে ভাবলাম কানের ডাক্তার দেখিয়ে যাই। শুনলাম তাও নেই।’
প্রতিদিন আবছারের মতো অনেকেই ফিরে যান, চোখ ও নাক-কান ও গলার সমস্যা নিয়ে। এছাড়া হাসপাতালে সিরাম ইলেক্ট্রোলাইট, থাইরয়েডের পরীক্ষা, ইকো, সিটিস্ক্যানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা না থাকায় রোগীদের প্রতিদিন যেতে হয় বিভিন্ন বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘হাসপাতালে ডাক্তার দেখার পর অনেক পরীক্ষা দিয়েছেন। এর মধ্যে রক্তের দুটি পরীক্ষা বাইরে থেকে করা লাগছে।’
হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বাগেরহাটের স্বাস্থ্য উপকমিটির আহ্বয়ক বাবুল সরদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘১৫ বছরে বাগেরহাটে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। জেলার প্রধান হাসপাতালে একটা সিটিস্ক্যান মেশিন নেই, একটা ইকো মেশিন নেই, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। এভাবে চললে জেলার লোকজন কীভাবে সেবা পাবে।’
এ বিষয়ে বাগেরহাট ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের ৫৮টি প্রথম শ্রেণীর পদের মধ্যে ৩২টি পদই শূন্য। এছাড়া প্যাথলজিকক্যাল কিছু সংকটও রয়েছে। রোগীর সংখ্যাও বেশি। এর পরও আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি। জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’










