ঝালকাঠি
জেলার প্রায় আট লাখ মানুষের
স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে বিপুলসংখ্যক এ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা
নিশ্চিত করতে বেগ পেতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা বিবেচনা করে হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। নির্মাণ হয়েছে নয়তলা বিশিষ্ট আধুনিক ভবন। তবে ৭০ কোটি টাকা
ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো পড়ে রয়েছে আট মাস ধরে।
গত বছরের অক্টোবরে ভবনটি উদ্বোধন করা হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হয়নি চিকিৎসাসেবা।
রোগীরা বলছেন, জটিল রোগের চিকিৎসা পেতে এখনো তাদের যেতে হচ্ছে বিভাগীয় শহর বরিশালে। প্রায় ছয় বছর ধরে হাসপাতালটির অবকাঠামোর কাজ এখনো শেষ না হওয়া দুঃখজনক। অবশ্য জুনের মধ্যে ভবনটিতে পুরোদমে কার্যক্রম শুরুর কথা জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৩ সালে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ৫০ শয্যার অনুমোদন মেলে ১৯৮৫ সালে। এছাড়া ২০০৩ সালে ১০০ শয্যার প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন পায় হাসপাতালটি। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ১০০ শয্যার জনবল অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে ১০০ শয্যার হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা দেয়া অনেকটা কঠিন। সে বিবেচনায় হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১১ আগস্ট তৎকালীন শিল্প মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আমির হোসেন আমু ১০০ শয্যা হাসপাতাল চত্বরে ২৫০ শয্যার নতুন ভবন নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির আওতায় এ প্রকল্প গ্রহণ করে গণপূর্ত বিভাগ। ৩৪ কোটি ৮০ লাখ ৪৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ১১তলা ফাউন্ডেশনের ছয়তলা ভবন নির্মাণকাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোহিনুর এন্টারপ্রাইজ ও জিএম কনস্ট্রাকশন। মূল নকশায় ১১তলা ভবনের সপ্তম, অষ্টম ও নবম তলার কাজের জন্য পরে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৭০ কোটি ৯১ লাখ ১৮ হাজার টাকা করা হয়। লিফটসহ আধুনিক সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে হাসপাতালটিতে। হাসপাতালের প্রথম তলায় বহির্বিভাগে রোগী দেখার জন্য চিকিৎসকদের চেম্বার ও রোগ নির্ণয়ে ল্যাব থাকবে। সপ্তম ও অষ্টম তলায় থাকবে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও কেবিন। নবম তলায় থাকবে আইসোলেশন ওয়ার্ড, কিডনি ডায়ালাইসিস কক্ষ, অপারেশন থিয়েটারসহ প্রশাসনিক অফিস।
কার্যাদেশ অনুযায়ী, দেড় বছরে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল। পরে কয়েক দফা মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িয়ে চার বছরের মাথায় কাজ শেষ করা হয়। তবে পুরো কাজ শেষ না করেই গত বছরের ১৭ অক্টোবর হাসপাতালটি উদ্বোধন করা হয়। আট মাস পেরিয়ে গেলেও ভবনটি বুঝে পায়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এ প্রসঙ্গে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শামীম আহমেদ বলেন, ‘নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতির দাম বাড়াসহ নানা জটিলতার কারণে নির্মাণকাজে দেরি হয়েছে। তবে আগামী জুনের মধ্যেই নতুন ভবনে সেবা কার্যক্রম চালু হবে।’
এদিকে তড়িঘড়ি করে ভবন উদ্বোধন করা হলেও চালু হয়নি চিকিৎসাসেবা। এখনো হাসপাতালটির নির্মাণকাজ চলছে। স্থাপন করা হয়নি চিকিৎসাসেবার আধুনিক যন্ত্রপাতি, আইসোলেশন ইউনিট, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ, অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার ও লিফট। এ কারণে সুফল মিলছে না প্রকল্পটির।
বারবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা। শুরু থেকেই কচ্ছপ গতিতে চলে নির্মাণকাজ। মাঝে বিভিন্ন অজুহাতে কয়েক দফায় কাজ বন্ধও রেখেছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২৫০ শয্যা হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হলে এখানেই আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা মিলবে বলে মনে করেন সেবাপ্রত্যাশীরা।
ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সুমন হোসেন বলেন, ‘আমার মায়ের পায়ের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছিলাম। চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছেন। ভেবেছিলাম সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখানেই পাব। কিন্তু রক্ত পরীক্ষা হলেও এক্স-রে করাতে হয়েছে বাইরে থেকে। নতুন ভবনটিতে চিকিৎসা কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে সামান্য বা জটিল রোগেও বরিশাল যেতে হতো না।’
চিকিৎসা নিতে আসা সোলেমান হোসেন বলেন, ‘ডায়রিয়া, পেট ব্যথা, কাশি, সর্দি, জ্বর ছাড়া আর বড় কোনো চিকিৎসা মিলছে না। এত বড় ভবন, দামি যন্ত্রপাতি আমাদের কতটুকু উপকারে আসছে?’
সারেংগল এলাকার মোসা. কোহিনুর বেগম বলেন, ‘হাসপাতালে ভালো মেডিসিন ও সার্জারির চিকিৎসা পাওয়া যায় না। বেশি সমস্যা হলে বরিশালে পাঠিয়ে দেন চিকিৎসকরা। আমাদের মতো গরিব মানুষের কি বরিশালে গিয়ে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব? ঝালকাঠি হাসপাতাল বাড়ির কাছাকাছি, তাও ১০০ টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে আসতে হয়। এখানে সব রোগের চিকিৎসাসেবা চালু হলে আমাদের উপকার হতো।’










