ডেঙ্গু জ্বর ও শরীর ব্যথা কমে এলেও স্বস্তি ফিরছে না অনেক রোগীর। জ্বর কমার সঙ্গে সঙ্গে কারো শরীরে দেখা দিচ্ছে লালচে র‍্যাশ, কারো হচ্ছে তীব্র চুলকানি। আবার কারো ত্বকে দেখা দিচ্ছে কালচে দাগ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি সমস্যা সেরে উঠতে না উঠতেই দেখা দিচ্ছে আরেকটি। এতে ডেঙ্গুর ধকল কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে গিয়ে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়ছে অনেক রোগী।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আব্দুল মতিনের বয়স ৪০। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সাতদিন ধরে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। জ্বর ও শরীর ব্যথাসহ অন্যান্য উপসর্গ ধীরে ধীরে কমে এলেও দুদিন ধরে তার দেহে দেখা দিয়েছে র‍্যাশ ও চুলকানি। ডেঙ্গুর উপসর্গ কমে আসার মধ্যেই নতুন এ সমস্যা দেখা দেয়ায় অস্বস্তি কাটছে না তার।

চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুর আরোগ্য পর্যায়ে ত্বকে র‍্যাশ ও চুলকানি দেখা দেয়া পরিচিত ঘটনা। সংক্রমণ-পরবর্তী সময়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে এসব উপসর্গের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে ত্বকের সব সমস্যাকেই ডেঙ্গুর প্রভাব বলে ধরে নেয়া ঠিক নয়। কিছু ক্ষেত্রে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অন্য কোনো চর্মরোগের কারণেও এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

মাদানী হাসপাতাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জেনারেল ফিজিশিয়ান ও ডার্মাটোলজিস্ট ডা. ইব্রাহীম মাসুম বিল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর পর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে র‍্যাশ ও চুলকানি অন্যতম। সাধারণত ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পঞ্চম বা ষষ্ঠ দিনে এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি গুরুতর কিছু নয়; বরং রোগীর আরোগ্য পর্যায়ের লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়। তবে কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়ও একই ধরনের উপসর্গ হতে পারে।’

ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর ত্বকের সমস্যায় ভোগার অভিজ্ঞতা হয়েছে বেসরকারি চাকরিজীবী তৌফিকুর রহমানেরও। সম্প্রতি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তিনি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার এক সপ্তাহ পর তার ত্বকে খোসপাঁচড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরে চিকিৎসা নিয়ে সে সমস্যা থেকে সেরে ওঠেন। কিন্তু এরপর দেখা দেয় আরেক ধরনের চর্মরোগ। সেটির চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়ার পর শুরু হয় অ্যালার্জির সমস্যা। বর্তমানে এরও চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবনের পাশাপাশি মলম ব্যবহার করছেন বলে জানান তৌফিক।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তৌফিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গু জ্বরের পর তীব্র দুর্বলতা দেখা দেয়। এর প্রায় এক সপ্তাহ পর একের পর এক ত্বকের সমস্যা শুরু হয়। এগুলোর চিকিৎসা চলছে এখনো।’

ডেঙ্গুর আরোগ্য পর্যায়ে ত্বকের এমন পরিবর্তনের বিবরণ রয়েছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণায়ও। ২০২৫ সালের জুনে ‘কিউজেএম: অ্যান ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে লালচে ও চুলকানিযুক্ত র‍্যাশের কথা তুলে ধরা হয়। এসব র‍্যাশের মধ্যে ত্বকের স্বাভাবিক রঙের কিছু অংশ অক্ষত থাকতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের বৈশিষ্ট্যকে ‘হোয়াইট আইল্যান্ডস ইন আ সি অব রেড’ বলা হয়। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত সবার ক্ষেত্রে এ উপসর্গ দেখা যায় না।

বাংলাদেশেও ডেঙ্গু-পরবর্তী শারীরিক জটিলতা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ঢাকায় ২৫১ জনের ওপর পরিচালিত একটি প্রশ্নমালাভিত্তিক গবেষণায় ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার তথ্য উঠে আসে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ১৭ দশমিক ৯ শতাংশের চুল পড়ার সমস্যা দেখা গিয়েছিল। এছাড়া সহরোগের সঙ্গে আরোগ্য-পরবর্তী ত্বকের র‍্যাশের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে সীমিতসংখ্যক অংশগ্রহণকারীর ওপর পরিচালিত এ গবেষণার ফল দিয়ে দেশের সব ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ত্বকের সমস্যার প্রকৃত ব্যাপকতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

ত্বকের র‍্যাশের ধরন ও তা দেখা দেয়ার সময়ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাজহারুল ইসলাম সোহেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীদের শরীরে সাধারণত দুই ধরনের র‍্যাশ দেখা যেতে পারে। একটি সংক্রমণের শুরুর দিকে, অন্যটি রোগী সুস্থ হয়ে ওঠার পর্যায়ে। প্রথম ধরনের র‍্যাশের সঙ্গে বিপজ্জনক জটিলতা দেখা দেয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। অন্যদিকে, জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ কমে আসার সময় যে র‍্যাশ দেখা দেয়, তা সাধারণত আরোগ্য পর্যায়ের লক্ষণ। এ ধরনের র‍্যাশের সঙ্গে চুলকানিও থাকতে পারে এবং সাধারণত পাঁচ-ছয়দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে সেরে যায়। তবে র‍্যাশের ধরন বুঝে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেয়া জরুরি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৬৯৯ জন। একই সময়ে এ রোগে মৃত্যু হয়েছে ৩৭৭ জনের। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ১৩২ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৬ হাজার ১৯০ জন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর আরোগ্য পর্যায়ে র‍্যাশ ও চুলকানি দেখা দিলে সব ক্ষেত্রে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ত্বকের সমস্যা দেখা দিলেই সেটিকে ডেঙ্গুর স্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভেবে উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। উপসর্গের ধরন, রোগীর শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য লক্ষণ বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। বিশেষ করে র‍্যাশের সঙ্গে নতুন করে জ্বর, রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি বা অন্য কোনো বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।