করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে রমজানের শুরুর দিন থেকেই দেশব্যাপী লকডাউন চলছে। শুক্রবার তৃতীয় রোজার ইফতারের আগে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী চকবাজার ঘুরে দেখা গেছে, তেমন ক্রেতাসমাগম নেই। এর আগের দুদিন ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের বসতে দেখা না গেলেও গতকাল বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসেছেন। কিন্তু ক্রেতা কম থাকায় হতাশ হতে হয়েছে তাদের। এ নিয়ে টানা দুই বছর জৌলুসহীন কাটছে চকবাজারের ঐতিহ্যবহুল ইফতারির হাট।
গতকাল জুমার পর থেকেই চকবাজারের ইফতারির দোকানগুলো খুলে যায়। একজন-দুজন করে হকারও বসতে শুরু করেন ফুটপাতে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দু-একজন ক্রেতা আসতে শুরু করলেও সার্বিক বিবেচনায় গতকালও জমেনি রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী এ ইফতারির হাট। মূলত লকডাউনের কারণেই দূর-দূরান্তের ক্রেতারা আসতে পারছেন না। তাছাড়া আশপাশের এলাকার মার্কেট বন্ধ থাকার ফলেও নিয়মিত কাস্টমার হারাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
অ্যাপল ফুডের দোকানি মো. কাওসার বলেন, গত বছর আমরা ৩৬ রকমের ইফতার সামগ্রী বিক্রি করেছি। কিন্তু এবার তার অর্ধেক অর্থাৎ ১৮ রকমের ইফতার সামগ্রী নিয়ে দোকান করছি। এবার দাম কমিয়ে দিয়েও আমরা ক্রেতা পাচ্ছি না।
ইফতারির অন্যতম আইটেম জিলাপি। রস, আলাউদ্দিন সুইটস এবং আরো দু-একটি মিষ্টির দোকানি জানিয়েছেন, অন্যান্য সময় বিশাল বিশাল জিলাপি বিক্রি হতো। এবার ও গতবার লকডাউনের কারণে বাজার নষ্ট হয়ে গেছে। রসের দোকানি সেলিম বলেন, গত দুই বছর ঘিয়ে ভাজা চিকন জিলাপি বিক্রি করছি। প্রতিদিন অল্প পরিমাণ জিলাপি রাখি, তাও পুরোপুরি শেষ হয় না।
চকবাজারের জনপ্রিয় ইফতারির আইটেম ‘বাপের বড় পোলায় খায়’। অভিজাত এ আইটেম এবার অল্প কিছু দোকানিকে বিক্রি করতে দেখা গেছে। এছাড়া ইফতারির অনেক ঐতিহ্যবাহী আইটেম যেমন সুতি কাবাব (গরু ও খাসি), আস্ত খাসি ভুনা, আস্ত মুরগি, কবুতর ও কোয়েল পাখি ভুনা, শাহি কাবাব, শাহি রেজালা, শাহি কাচ্চিসহ ইত্যাদি আইটেম খুব একটা চোখে পড়েনি। দু-একজন দোকানি হাতে গোনো কয়েক পিস বিভিন্ন রোস্ট ও রেজালা দোকানে উঠালেও কোনো দিন বিক্রি হয়, কোনো দিন অবিক্রীত রয়ে যায়।
পুরান ঢাকার স্থানীয় লোকজন বলছেন, গত বছর শেষের দিকে সপ্তাহখানেকের জন্য ইফতারির দোকানগুলো খোলা ছিল। তখনো বাজার খুব একটা জমেনি। এবার তো রোজার শুরুর দিন থেকেই লকডাউন।
পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা ইফতেখার চৌধুরী বলেন, চকবাজারের ইফতারির সুনাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে গেছে। সরকারের উচিত ছিল লকডাউনের মাঝেও কাঁচা বাজারের মতো একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ইফতারির ব্যবসা করার সুযোগ দেয়া।
বনানী থেকে ব্যাংক কর্মকর্তা রিজভি এসেছেন চকবাজারে ইফতারি কিনতে। তিনি বলেন, রোজার প্রথম শুক্রবার ভালো-মন্দ ইফতারি কিনতে অনেক দূর থেকে এসেছি। কিন্তু এসে খুব হতাশ হলাম। অন্যান্য সময় মুখরোচক যেসব আইটেম পাওয়া যেত, আজ সেসবের অনেক কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
এদিকে গত দুইদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফুটপাতে ইফতারি বিক্রির ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে থাকলেও গতকাল কিছুটা শিথিল অবস্থা দেখা গেছে। এর আগের দুইদিন কোনো হকারকে বসতে না দিলেও গতকাল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হকারকে বেচাবিক্রি করতে দেখা গেছে। সবুজ নামের একজন হকার বলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) ১৪ হাজার টাকার বিরিয়ানি নিয়ে বসেছিলাম। পুলিশ বারবার উঠিয়ে দিয়েছে। শেষে সব বিরিয়ানি ফেলে দিতে হয়েছে। আজ জিলাপি নিয়ে বসেছি। কিছু একটা করে সংসার চালাতে হবে তো।
একই অবস্থা পানীয় ও শরবত বিক্রেতাদেরও। চকবাজার শাহি মসজিদ থেকে একটু দূরে কয়েকটি শরবতের দোকানে দেখা গেছে বাহারি রকমের শরবত, মাঠা, লাবাং, লাচ্ছি, ফালুদা, ফুড কাস্টার্ডসহ আরো কয়েক ধরনের পানীয় নিয়ে পসরা সাজিয়েছেন দোকানিরা। বসেছে নানা রকম পিঠাপুলির দোকানও। কিন্তু এখানেও হাতে কয়েকজন ক্রেতা ছাড়া তেমন লোক সমাগম হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পুলিশের সতর্ক অবস্থান এবং কয়েক জায়গায় রাস্তা বন্ধ করে রাখার ফলে ক্রেতা সমাগম কম। যেসব ক্রেতার ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেল আছে তারাই আশপাশের এলাকা থেকে ইফতারি কিনতে আসেন। দূরের লোকজন তেমন একটা আসতে পারছেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দায়িত্বরত একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখতেই এ বছর ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের বসতে দিচ্ছি না। তবুও মানবিক কারণে অল্প সময়ের জন্য বিক্রির সুযোগ দিচ্ছি। যখন ওপর থেকে চাপ আসে, তাদের উঠে যেতে বলি।










