মাত্র ৯৫ জনের জনবল নিয়ে চলছে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর মেডিকেল যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও সচল রাখার কাজে নিয়োজিত সংস্থা ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (নিমিউ অ্যান্ড টিসি)। ১৯৯৩-৯৪ সালে সর্বশেষ বাড়ানোর পর গত ২৬ বছরে সংস্থাটির জনবল বাড়ানোর আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
‘সচল মেডিকেল যন্ত্রপাতি, নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা’—এ রূপকল্প নিয়ে ১৯৮৩ সালে ৮৩ জন জনবল নিয়ে গঠন করা হয় নিমিউ অ্যান্ড টিসি। সরকারি হাসপাতালের মেডিকেল যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও সচল রাখার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের মাধ্যমে জনসাধারণের সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৯৩-৯৪ সালে আরো ১২ জনকে নিয়োগদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির জনবল ৯৫ জনে উন্নীত করা হয়। এরপর আর জনবল বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সর্বশেষ জনবল বৃদ্ধির সময়কার তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক সেবা চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। কিন্তু নিমিউ অ্যান্ড টিসির জনবল একজনও বাড়েনি। এতে করে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান বিপুল সেবা চাহিদার বিপরীতে নিমিউ অ্যান্ড টিসির বিদ্যমান জনবল ও সক্ষমতা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা সেবা দেয়ার বিষয়টিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলেছে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি।
সম্প্রতি জরুরিভিত্তিতে দ্রুত নিয়োগ দেয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন করেছে নিমিউ অ্যান্ড টিসি। এতে বলা হয়, জরুরি ভিত্তিতে পিএসসির মাধ্যমে ১০০ জন গ্র্যাজুয়েট বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার এবং ৭৩৫ জন ইলেকট্রো-মেডিকেল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ করা প্রয়োজন।
আবেদনে আরো বলা হয়, দেশের ১৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিটিতে একজন করে ১৭ জন সহকারী প্রকৌশলী এবং তিনজন করে মোট ৫১ জন উপসহকারী প্রকৌশলীর প্রয়োজন। এছাড়া ১৫টি বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রতিটিতে একজন করে সহকারী প্রকৌশলী এবং তিনজন করে সহকারী প্রকৌশলী প্রয়োজন। এছাড়া দেশের ৬১টি জেলা হাসপাতালের প্রতিটিতে দুজন করে মোট ১২২ জন, ৫১৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, টিবি হাসপাতাল এবং মা ও শিশু হাসপাতালের প্রতিটিতে একজন করে আরো ৫১৭ জন নতুন জনবলের প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়াও আবেদনে নিমিউ অ্যান্ড টিসির প্রধান কার্যালয়েও ৬৮ জনের নিয়োগের কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য হলো, মহামারী পরিস্থিতি মোকাবেলার স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে পিএসসি শুধু প্রিলিমিনারি বা মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে এ নিয়োগ দিতে পারে এবং নিয়োগের পর সে অনুযায়ী নিমিউ অ্যান্ড টিসিতে পদসৃজনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এসব জনবল নিয়োগ দিলে বেতন-ভাতা বাবদ বছরে আনুমানিক ব্যয় হবে ৩২ কোটি টাকা, তবে সুবিধা মিলবে অনেক বেশি।
তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠানটির এ প্রস্তাবে সায় দেয়নি এখনো। এক্ষেত্রে আগে পদসৃজন করে তারপর নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিমিউ অ্যান্ড টিসির চিফ টেকনিক্যাল ম্যানেজার (উপসচিব) মোহা. আমিনুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, চলমান মহামারী মোকাবেলা করতে জরুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদনে প্রয়োজনে শুধু প্রিলিমিনারি বা মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগ কার্যকর এবং নিয়োগের পর সে অনুযায়ী পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছিল। তবে মন্ত্রণালয় আমাদের আবেদনে সাড়া দেয়নি। মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, আগে পদ সৃষ্টি করে পরে নিয়োগ দিতে। আমরা পদ সৃষ্টির প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছি। আগামী সপ্তাহের মধ্যে আবেদনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখান থেকে অনুমোদন মিললেই পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে। তবে এসব নিয়োগ যাতে দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়, সেজন্য আমাদের উদ্যোগ থাকবে।
নিমিউ অ্যান্ড টিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম জনবল নিয়ে পরিচালিত হওয়ায় সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরবচ্ছিন্ন সেবায় যেমন ব্যাঘাত ঘটছে, তেমনি বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন ইলেকট্রোমেডিকেল বিষয়ের শিক্ষার্থীরাও।
জানা গিয়েছে, ২০০৬ সালে দেশের বেশকিছু সরকারি পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে ইলেকট্রো মেডিকেল বিষয়ে পাঠদান শুরু হয়। এ বিষয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষ হয় ২০১০ সালে। এখন পর্যন্ত বেশ কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এ ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেছে। যদিও তাদের কেউই সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় বসতে পারেননি। কারণ দীর্ঘদিনেও এসব পদে কোনো নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি আসেনি। এ অবস্থায় সরকারি নিয়োগ চালুর জন্য বাংলাদেশ ইলেকট্রো-মেডিকেল ছাত্র সংসদ নামে প্রস্তাবিত একটি সংগঠনও আন্দোলন করছে।
প্রস্তাবিত সংগঠনটির আহ্বায়ক মো. কাউছার আহমেদ সারোয়ার বলেন, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ করতে বাইরের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে থাকতে হয়। ওয়ারেন্টি পিরিয়ড পার হলে অনেক মেডিকেল যন্ত্রপাতি সচল করতে আবার নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করতে হয়। তাতে অর্থ ব্যয় হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে সামান্য কিছু ত্রুটি সারিয়ে একটি মূল্যবান মেডিকেল যন্ত্রপাতি সচল করা সম্ভব। নিজস্ব জনবল না থাকায় এসব টুকটাক ত্রুটি সারিয়ে না তুলে বছরের পর বছর মূল্যবান মেডিকেল যন্ত্রপাতি ফেলে রাখা হয়। তাতে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হয়। এ খাতে সরকারি নিয়োগ দিলে বেতন-ভাতা হিসেবে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, সুফল পাওয়া যাবে তার থেকে অনেক বেশি।









