সাবেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের এপ্রিলে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিষেধাজ্ঞা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর ওই বছরের জুলাইয়ে ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। যদিও এখন পর্যন্ত ইউজিসির কমিটির তদন্তের কাজে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বললেই চলে। অন্যদিকে ইউজিসির তদন্ত শেষ না হওয়ার অজুহাতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করছে না মন্ত্রণালয়। সব মিলিয়ে ইউজিসির ওই তদন্তের ফাঁদে আটকে আছে নোবিপ্রবির শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া।

জানা যায়, গত বছরের এপ্রিলের দিকে নোবিপ্রবির তত্কালীন উপাচার্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম করে শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগের অভিযোগ উঠলে বিশ্ববিদ্যালয়টির সব ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করে দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর ঘটনার তদন্তে ওই বছরের জুলাইয়ে ইউজিসির তত্কালীন সদস্য অধ্যাপক ড. এম শাহ নওয়াজকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি করা হয়। ওই কমিটি প্রাথমিক কিছু তথ্য ও সাক্ষাত্কার সংগ্রহের পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইউজিসির সদস্যপদ থেকে অবসরে যান ড. শাহ নওয়াজ। এরপর নতুন করে তদন্ত কমিটি হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত সেটি হয়নি। সে হিসেবে প্রাথমিক কিছু কার্যক্রমের বাইরে তদন্ত কার্যক্রমের তেমন কোনো অগ্রগতিই নেই। এমনকি ওই কমিটির সদস্যরাও এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য দিতে পারছেন না। যদিও ইউজিসির তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের অজুহাত দেখিয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করছে না মন্ত্রণালয়।

নোবিপ্রবির ওই তদন্ত কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন ইউজিসির আরেক সদস্য অধ্যাপক ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যাবে না বিষয়টি তেমন নয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি শিক্ষক সংকট থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত সেটি আমাদের লিখিতভাবে জানানো। আমরা সে আলোকে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করব।

এদিকে ১৬ মাস ধরে চলা নিষেধাজ্ঞায় নোবিপ্রবির একাডেমিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে বেশকিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন বিভাগগুলোতে এমনিতেই শিক্ষক সংকট। উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষকদের বিদেশ পাড়িতে সে সংকট আরো তীব্র হয়েছে। যদিও নিষেধাজ্ঞার কারণে সংকট নিরসনে কোনো শিক্ষকই নিয়োগ দিতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অন্যদিকে শিক্ষা ছুটির বিপরীতে অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ৬০ শিক্ষকের পদায়নও আাাটকে আছে।

এদিকে নিয়োগকেন্দ্রিক জটিলতার সুরাহা না হওয়ায় শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। এ বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিতে সম্প্রতি উপাচার্যকে চিঠিও দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতি। চিঠিতে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শিক্ষক নিয়োগের অচলাবস্থার সমাধান করতে না পারলে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষক নেতারা।

গত ৩১ আগস্ট নোবিপ্রবি শিক্ষক সমিতি থেকে উপাচার্যকে দেয়া চিঠিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলো বিভাগেই পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়ে দুই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। ফলে শিক্ষার মান খারাপ হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা অবহেলিত হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকায় ও বিভাগ পরিচালনায় পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় অনেক বিভাগের শিক্ষকরা শিক্ষাছুটিতে যেতে পারছেন না। তাই ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ বিষয়টি সুরাহা না করতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনসহ বড় ধরনের কর্মসূচিতে যেতে আমরা বাধ্য হব।

শিক্ষকদের স্থায়ীকরণ বিষয়ে চিঠিতে বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ জন শিক্ষক শিক্ষাছুটির বিপরীতে অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত রয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রদত্ত নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের স্থায়ীকরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক শিক্ষকের পরবর্তী পদে পদোন্নতির সময়ও প্রায় এক বছর পার হয়েছে। তাদের পর স্থায়ী পদে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরাও পদোন্নতি পেয়ে গেছেন। ফলে শিক্ষকদের মাঝে এক ধরনের বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে।’

শিক্ষক সংকট প্রসঙ্গে নোবিপ্রবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর বণিক বার্তাকে বলেন, নিষেধাক্ষা দেয়ার পর গত ১৬ মাসে কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়নি। উল্টো অনেক শিক্ষক শিক্ষাছুটি ও মাতৃত্বকালীন ছুটিতে গেছেন। ফলে শিক্ষক সংকট আরো তীব্র হয়েছে। এছাড়া স্থগিতাদেশের কারণে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া প্রায় ৬০ জন শিক্ষকের স্থায়ী নিয়োগ না হওয়ায় তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে একাডেমিক অঙ্গনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা এ সমস্যার দ্রুত সমাধান চাই।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানে বিভাগ সংখ্যা ২৮টি ও ইনস্টিটিউট দুটি। এর মধ্যে ১৪টি বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউটই খোলা হয়েছে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক অহিদুজ্জামানের মেয়াদে। এর প্রায় সবকয়টিতেই শিক্ষক সংকট রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শিক্ষক সংকট সবচেয়ে বেশি উপাচার্য অহিদুজ্জামানের সময়ে খোলা বিভাগ ও ইনস্টিটিউটগুলোতে। দুজন শিক্ষক নিয়ে চলা আইন ও তিনজন শিক্ষক নিয়ে চলা সমাজকর্ম বিভাগ তারই সময় খোলা হয়েছিল। তার মেয়াদে খোলা অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে প্রাণিবিজ্ঞান ও শিক্ষা প্রশাসন বিভাগে চারজন করে শিকক রয়েছেন। ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন সায়েন্সে শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই), প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান, শিক্ষা, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি, সমাজবিজ্ঞান ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগে মাত্র ছয়জন করে শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে সমাজবিজ্ঞান ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগে একজন করে শিক্ষক ছুটিতে রয়েছেন। ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি, স্ট্যাটিস্টিকস ও বাংলাদেশ অ্যান্ড লিবারেশন ওয়ার বিভাগে সাতজন করে শিক্ষক রয়েছেন।

গত বছরের শুরুর দিকে তত্কালীন উপাচার্যের অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার ফিরিস্তি তুলে ধরে সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী বরাবর অভিযোগপত্র জমা দেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অভিযোগপত্রে প্রয়োজনের অধিক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, নিকটআত্মীয়দের নিয়োগ, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়।