সড়কের ওপর দিয়ে রেললাইন গেলে দুর্ঘটনা এড়াতে সেখানে লেভেল ক্রসিং গেট (এলসি গেট) বসানোর নিয়ম রয়েছে। এসব এলসি গেটের মধ্যে আবার শ্রেণীভেদও রয়েছে। এর মধ্যে যানবাহনবহুল ও সড়ক বিভাজকসমৃদ্ধ সড়কগুলোয় ব্যবহার করা হয় স্পেশাল লেভেল ক্রসিং গেট। মূলত মেট্রোপলিটন নগর বা পৌরশহর এলাকাগুলোয় বসানো হয় বিশেষ ধরনের এ লেভেল ক্রসিং। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শহরের এসব স্পেশাল লেভেল ক্রসিংই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এসব স্পেশাল লেভেল ক্রসিংয়ে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাও ঘটছে নিয়মিতভাবে।
স্পেশাল, এ, বি, সি, ডি ও অন্যান্য—রেলের লেভেল ক্রসিং গেটগুলোকে মূলত এ ছয় শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। এসব এলসি গেটে লোকবলও নিয়োগ দেয়া হয় ক্যাটাগরি ভিত্তিতে। নিয়ম অনুযায়ী স্পেশাল শ্রেণীর এলসি গেটগুলোয় তিন শিফটে ছয়জন (প্রতি শিফটে দুজন করে) গেটকিপার নিয়োজিত থাকার কথা। কিন্তু দেশের অধিকাংশ স্পেশাল লেভেল ক্রসিংয়ে গেটকিপার রয়েছেন তিনজন করে। অর্থাৎ প্রতি শিফটে উচ্চমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ এসব এলসি গেটে গেটকিপার দায়িত্ব পালন করেন একজন করে। উভয়মুখী সড়কে স্থাপিত এসব গেটে ট্রেন আসার সময় দুদিকের যানবাহন প্রতিরোধক (ডাবল ব্যারিয়ার) ফেলা হয়। কিন্তু এর পরও বিপত্তি বাধায় বিপরীত দিক থেকে আইন অমান্য করে আসা যানবাহনগুলো। আইন ও প্রতিরোধক অমান্য করে আসা এসব যানবাহনের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে যাত্রীদের হতাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রেলের জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। এ কারণে চাইলেও লেভেল ক্রসিং গেটগুলোয় চাহিদা অনুযায়ী গেটকিপার নিয়োগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রকল্প বা বিভিন্ন দপ্তরের অধীনে টিএলআর হিসেবে অস্থায়ী ভিত্তিতে গেটকিপার দেয়া রয়েছে। তবে লেভেল ক্রসিং গেটগুলোয় ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে সাধারণ যানবাহনগুলো দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ার পেছনে গেটকিপারদের দোষের চেয়েও আমাদের আইন অমান্য করার প্রবণতাই বেশি দায়ী।
স্পেশাল ক্রসিং গেটগুলোর বিষয়ে তিনি আরো বলেন, নিয়ম অনুযায়ী উভয়মুখী সড়কের লেভেল ক্রসিংগুলোয় ছয়জন করে গেটকিপার দেয়ার কথা। কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেভেল ক্রসিংয়ে প্রতি শিফটে দুজন করে গেটকিপার দেয়াও রয়েছে। বর্তমানে রেলের জনবল কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে অস্থায়ী গেটকিপারদের রাজস্ব খাতে নিয়ে যাওয়া ছাড়াও গেটকিপারের মঞ্জুরীকৃত পদ বাড়ানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। লোকবল নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে লেভেল ক্রসিং গেটের দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে।
রেলের পরিবহন বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরাঞ্চলের লেভেল ক্রসিংগুলোকে স্পেশাল শ্রেণীর ক্যাটাগরিতে রেখেছে রেলওয়ে। কিন্তু শ্রেণীতে আভিজাত্য দেখালেও লোকবল নিয়োগে উদাসীনতা রয়েছে। এ কারণে রেলের লেভেল ক্রসিংগুলোয় সংঘটিত দুর্ঘটনার বেশির ভাগই ঘটছে স্পেশাল ক্রসিংয়ে। স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী প্রতি শিফটে দুজন করে মোট ছয়জন গেটকিপার থাকার কথা। যদিও এসব স্পেশাল ক্রসিং পরিচালিত হচ্ছে মাত্র তিনজন গেটকিপার দিয়ে । ফলে অনেক সময় কেউ ছুটিতে গেলে কিংবা অসুস্থ হলে অন্য দুজনকে ৮ ঘণ্টার পরিবর্তে ১২ ঘণ্টা করে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাছাড়া লেভেল ক্রসিংয়ের সঙ্গে রেলের সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুমগুলোর টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাও এখনো শতভাগ কার্যকর হয়নি।
রেলের অন্যান্য লেভেল ক্রসিং গেটগুলোর মধ্যে ‘এ’ শ্রেণীর ক্রসিংয়ে লোকবল থাকার কথা তিনজন (প্রতি শিফটে একজন করে) এবং বি শ্রেণীতে দুজন (প্রতি ১২ ঘণ্টায় একজন) গেটকিপার থাকার কথা রয়েছে। এছাড়া ‘সি’, ডি’ ও অন্যান্য শ্রেণীভুক্ত লেভেল ক্রসিংগুলোয় কোনো গেটকিপার থাকবেন না। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন শহরের মধ্যে শুধু কদমতলী স্পেশাল শ্রেণীর লেভেল ক্রসিংয়ে ছয়জন গেটকিপার নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়া বাকি স্পেশাল ক্রসিংগুলোও নির্ধারিতের চেয়ে কমসংখ্যক গেটকিপার দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে। গেটকিপার পর্যাপ্ত না থাকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এসব ক্রসিংয়ে ছোটবড় দুর্ঘটনা নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
রেলের সর্বশেষ প্রকাশিত ওয়ার্কিং টাইম টেবিল নং-৫২ অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলের ঢাকা বিভাগে মোট লেভেল ক্রসিং রয়েছে ৩৭৫টি। এর মধ্যে স্পেশাল লেভেল ক্রসিং রয়েছে ৪০টি। এছাড়া ‘এ’ শ্রেণীর ক্রসিং রয়েছে ২০টি, ‘বি’ শ্রেণীর ৪৩টি, ‘সি’ শ্রেণীর ২৩৫টি, ‘ডি’ শ্রেণীর ৩১টি ও অন্যান্য শ্রেণীর ক্রসিং রয়েছে ছয়টি। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগের মোট বৈধ ক্রসিং রয়েছে ১৩৭টি। এর মধ্যে স্পেশাল লেভেল ক্রসিং রয়েছে ১৭টি। এছাড়া আটটি ‘এ’ শ্রেণীর ক্রসিং, ৩২টি ‘বি’ শ্রেণীর, ৭৩টি ‘সি’ শ্রেণীর ও সাতটি ‘ডি’ শ্রেণীর ক্রসিং রয়েছে। পূর্বাঞ্চলের মোট ৫৭টি স্পেশাল শ্রেণীর লেভেল ক্রসিং প্রধানত ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বড় জেলা শহরভিত্তিক। নড়বড়ে ক্রসিং অবকাঠামো ও লোকবলের অভাবে এসব ক্রসিংয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন রেলওয়ের পরিবহন বিভাগসংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ গত শনিবার চট্টগ্রামের জাকির হোসেন রোডে লেভেল ক্রসিং গেটে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাস ও ডেমু ট্রেনের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়। আহত হয় বেশ কয়েকজন। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ট্রাফিক বিভাগের আওতাধীন টি/৩ স্পেশাল ক্রসিং গেটটি ঝাউতলা-ষোলশহর সেকশনের মধ্যে অবস্থিত। স্পেশাল লেভেল ক্রসিং গেটটিতে নিয়ম অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন শিফটে ছয়জন গেটকিপার কর্মরত থাকার কথা ছিল। কিন্তু লোকবল সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এখনো গেটকিপার রয়েছেন মাত্র তিনজন। অর্থাৎ যানবাহন চলাচলের এ ক্রসিংয়ে প্রতি ৮ ঘণ্টায় একজন গেটকিপার দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ দুর্ঘটনার দিন একজন গেটকিপার ছুটিতে ছিলেন। এ কারণে অন্য দুই গেটকিপার পালা করে প্রতি শিফটে ১২ ঘণ্টা করে কাজ করছিলেন। নিয়মের অতিরিক্ত কাজ করার কারণে ক্লান্তিজনিত অবহেলা তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, রাজধানীর গেন্ডারিয়া-ঢাকা, ঢাকা-তেজগাঁও, তেজগাঁও-ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট-ঢাকা বিমানবন্দর সেকশনে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি স্পেশাল লেভেল ক্রসিংয়ে বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে যানবাহন ও পথচারী। চট্টগ্রামেও এ দুর্ঘটনার মাত্রা ঝাউতলা-ষোলশহর, ষোলশহর-চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট, পাহাড়তলী-ফৌজদারহাট সেকশনের স্পেশাল ক্রসিংয়ে সবচেয়ে বেশি।
রেলের প্রকৌশল বিভাগ বলছে, স্পেশাল লেভেল ক্রসিংগুলোর বিদ্যমান ব্যারিয়ারগুলোও দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর নয়। তাদের দাবি, বাংলাদেশের ট্রাফিক অসচেতনতার কারণে ট্রেন আসার আগে সিগন্যাল দিয়ে ব্যারিয়ার ফেলে দেয়া হলেও উভয়মুখী (বিভাজকযুক্ত দুই বা চার লেনের সড়ক) সড়কের ক্ষেত্রে যানবাহনগুলো ট্রেন যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে চায় না। এসব যানবাহনের ক্ষেত্রে আইন অমান্য করে বিপরীত দিক দিয়ে এসে ট্রেন লাইন পার হওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যায়। এ কারণে লেভেল ক্রসিংয়ে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। এ ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এজন্য স্পেশাল গেট লেভেল ক্রসিংয়ের ক্ষেত্রে উভয়মুখী সড়কের চারদিকেই ব্যারিয়ার স্থাপন জরুরি।









