বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের প্রায় সাত মাস পর প্রথমবারের মতো সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনা, জনগণের সেবা নিশ্চিত করা, জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি সোলার প্যানেল স্থাপন এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কায় সরকার আগাম সতর্কতা অবলম্বন করছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় আমদানিনির্ভর জ্বালানির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারি দপ্তরে অপেশাদার আচরণ, সেবাপ্রত্যাশী জনগণকে হয়রানি এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়মের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
গতকাল বিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে এ সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা অংশ নেন। সভার আলোচ্যসূচির নির্ধারিত চারটি এজেন্ডার মধ্যে ছিল সরকারের চলমান বিভিন্ন কার্যক্রমের বিষয়ে আলোচনা; সরকারের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল, জনকল্যাণমুখী ও কার্যকর করার উপায়; সচিবদের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা, যা জনগণের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-৩০)’ বাস্তবায়ন।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে সৌরবিদ্যুতের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মূলত নবায়নযোগ্য জ্বালানিই ছিল আলোচনার প্রধান ইস্যু। এছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে অভিযান আরো জোরদার করা এবং ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কার্যক্রম কীভাবে আরো কার্যকর ও নিবিড়ভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে বৈঠকের মূল বিষয় ছিল সৌরবিদ্যুৎ।’
এছাড়া সরকারের কর্মকাণ্ড আরো গতিশীল করে কাজ দ্রুত করা, শূন্য পদ পূরণসহ বিভিন্ন বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। উন্নয়নকাজ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং খাল খননের কাজ ঠিকমতো করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সচিব সভায় সরকারের অগ্রাধিকারমূলক বিভিন্ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রশাসনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়। সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে যাতে সাধারণ মানুষ অযথা হয়রানির শিকার না হন এবং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অপেশাদার বা অনৈতিক সুবিধা দাবি করতে না পারেন, সে বিষয়ে সচিবদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
সভায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়গুলোও আলোচনায় আসে। একই সঙ্গে সরকারি সম্পত্তি বেহাত হওয়া ঠেকানো এবং এরই মধ্যে বেদখল হওয়া সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের এক সচিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরো বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকার আগেভাগেই সতর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যাতে দেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে না পারে, সেজন্য আমদানিনির্ভর জ্বালানির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’
সরকারের এ সচিব আরো বলেন, ‘বিশেষ করে দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার কীভাবে আরো বিস্তৃত করা যায়, তা নিয়ে সভায় বেশি আলোচনা হয়েছে। সরকারি ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনায় সৌর প্যানেল স্থাপন, বেসরকারি খাতকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তির অংশ বাড়ানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।’
সভায় বলা হয়, জ্বালানি খাতে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মোকাবেলায় শুধু প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প ও নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সরকারি ভবনগুলোতে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ রয়েছে বলেও আলোচনায় উঠে আসে।
প্রশাসনের শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির বিষয়টিও সচিব সভায় গুরুত্ব পায়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল হাজিরার মাধ্যমে কর্মস্থলে উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে এবং দায়িত্ব পালনে শৃঙ্খলা বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারি সেবার মান উন্নয়ন এবং জনগণের ভোগান্তি কমানোর ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সচিব সভায় সরকারের অগ্রাধিকারমূলক বিভিন্ন কর্মসূচির বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচি যাতে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন, সুবিধা বিতরণে স্বচ্ছতা এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে সচিবদের নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। কোনো ধরনের অনিয়ম, পক্ষপাত বা দুর্নীতির মাধ্যমে যাতে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশনার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
খাল খনন কর্মসূচির ক্ষেত্রেও অর্থ ব্যয়ের যথাযথ ব্যবহার এবং কাজের মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সরকারি অর্থ ব্যয় করে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর এর সুফল জনগণ পাচ্ছেন কিনা, তা মাঠপর্যায়ে নজরদারির আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
সভা শেষে আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে সরকারের আরেক সচিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূলত এটা প্রথম সচিব সভা। এখানে রুটিন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের নির্বাচনের ইশতাহারে সেসব বিষয় অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জ্বালানি ইস্যু গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে আমাদের সোলার প্যানেল স্থাপনের ক্ষেত্রে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
এছাড়া সরকারি সম্পত্তি রক্ষা এবং বেদখল সম্পত্তি উদ্ধারের বিষয়েও সচিবদের কার্যকর ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সরকারি জমি, স্থাপনা বা অন্যান্য সম্পদ যাতে অবৈধভাবে দখল বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।








