তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নানা উন্নয়ন প্রকল্পের ভিড়ে গুরুত্বপূর্ণ এ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন হচ্ছে ধীরগতিতে। অন্যদিকে ১৯৮৭ সালে চালু হওয়া কমলাপুর আইসিডি দীর্ঘদিন ধরে দেশের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ডিপো হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দীর্ঘসূত্রতা ও ধারাবাহিক অবহেলার কারণে ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে রেলমুখী পরিবহন থেকে সরে যাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশে আমদানি-রফতানির কনটেইনার হ্যান্ডলিং প্রতি বছরই বাড়ছে। সাশ্রয়ী, দ্রুত ও নিরাপদ পরিবহনের জন্য রেলপথকেই পণ্য পরিবহনের জন্য অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন ব্যবসায়ীরা। তাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) কনটেইনার পরিবহনের জন্য রেলওয়ের সহযোগিতা চাইত। বর্তমানে পরিস্থিতি উল্টো—রেলওয়েই বরং এখন আর কনটেইনার চেয়ে পাচ্ছে না। ফলে একসময় দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে ব্যবহৃত কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ১০ শতাংশ যেখানে রেলের মাধ্যমে হতো, এখন সে হার ৪ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও পণ্য পরিবহন খাতে পিছিয়ে পড়ছে রেলওয়ে, বাড়ছে লোকসান। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যও।

জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন দুই জোড়া ট্রেন চলাচল করত। বন্দরসংলগ্ন সিজিপিওয়াই (চিটাগং গুডস পোর্ট ইয়ার্ড) থেকে কনটেইনারবাহী ট্রেনগুলো ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে আমদানি কনটেইনার পরিবহন করে। আবার কমলাপুর আইসিডি থেকে রফতানি ও খালি কনটেইনার নিয়ে সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে আসে। ঈদুল ফিতরের আগে বন্দর ইয়ার্ডে কমলাপুর আইসিডিগামী কনটেইনার সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় বন্দর, ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে একাধিকবার রেলওয়েকে কনটেইনার পরিবহনে অনুরোধ করা হয়। তা সত্ত্বেও রেলওয়ের পক্ষ থেকে তেমন একটা সাড়া পায়নি সংশ্লিষ্টরা। মূলত দীর্ঘদিন ধরে পণ্য আটকে ব্যবসায়ীরা লোকসান দেয়ায় বিকল্প পথে ঝুঁকছেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পণ্যবাহী ট্রেনের অভাবে নিয়মিতভাবে কনটেইনার ঢাকায় পাঠানো যাচ্ছিল না। যোগাযোগ করা হলে রেলওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়—পর্যাপ্ত ইঞ্জিন না থাকায় তারা চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন পরিচালনা করতে পারছে না। স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কমলাপুরগামী যে কনটেইনারবাহী ট্রেনগুলো চলাচল করেছে তাও পর্যাপ্ত নয়। ট্রেন সংকটের কারণে বন্দরে কনটেইনার পাঠাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এসব কারণে রমজানের আগে বন্দরে কনটেইনারের স্তূপ জমে গিয়ে অপারেশনাল কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটে। অথচ রেলপথে পণ্য পরিবহন ব্যবসায়ীদের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও নিরাপদ।’ সব মিলিয়ে সময়ক্ষেপণসহ বিভিন্ন ভোগান্তির কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয় বলে মনে করছেন তিনি।

রেলের তথ্যমতে, কমলাপুর আইসিডির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ৫০ হাজার। নতুন প্রকল্পে ধীরাশ্রমে সক্ষমতা বাড়িয়ে বার্ষিক ৪ লাখ ৩২ হাজার টিইউএস (টুয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) করার কথা রয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে যাওয়া কনটেইনার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন আইসিডিতে প্রবেশ করে। এতে রেলের পাশাপাশি পুরো ঢাকা শহরেই কনটেইনারবাহী যানবাহনের চাপ তৈরি হয়। এজন্য গাজীপুরের পূবাইল রেলওয়ে স্টেশন হয়ে ধীরাশ্রমে প্রস্তাবিত আইসিডিতে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটির জন্য এরই মধ্যে ২৩০ দশমিক ৯৪ একর জমি অধিগ্রহণ করছে রেলওয়ে। পূবাইল থেকে ধীরাশ্রম পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে ৭ দশমিক ১৬ কিলোমিটার রেলপথ। তবে নানা উন্নয়ন প্রকল্পের ভিড়ে অদৃশ্য কারণে এর কাজ চলছে ধীরগতিতে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কমলাপুর আইসিডিতে পণ্য অ্যাসেসমেন্ট করতে রেলপথেই পণ্য পরিবহন করতে হয়। কিন্তু রেলে পণ্য ঢাকায় নিয়ে যেতে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। রেলওয়ের নতুন নতুন ট্রেন সার্ভিস চালু, দেশব্যাপী রেল নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির পাশাপাশি বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও পণ্য খাতে ইঞ্জিন সরবরাহের কোনো উদ্যোগ নেই। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে রেলপথে পণ্য পরিবহন শূন্যের কোটায় নেমে আসতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

রেলপথে পণ্য পরিবহনের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে এমএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন মিন্টু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের শিল্প খাতের বিকাশে কমলাপুর আইসিডির মাধ্যমে রেলওয়ের অবদান ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেলওয়ে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্য পরিবহনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। নানা বিনিয়োগ সত্ত্বেও রেলওয়ে পণ্য খাতকে অবহেলা করে গেছে। ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোয়, বিশেষ করে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনে রেলের ব্যর্থতা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। লাভের পরিবর্তে লোকসানের আশঙ্কায় ব্যবসায়ীদের অনেকেই কার্যত রেলপথে পণ্য পরিবহন এড়িয়ে চলছেন।’

সার্ভিস পরিচালনায় সামগ্রিকভাবে লোকসানে থাকলেও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল থেকেই প্রতি বছর লাভ করে রেলওয়ে। তবে এ লাভজনক খাতটি বর্তমানে ইঞ্জিন সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রেলওয়ের তথ্যমতে, পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনায় দৈনিক প্রায় ১৬টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন হলেও বাস্তবে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র তিন থেকে পাঁচটি। ফলে নিয়মিতভাবেই পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীবাহী ট্রেনের চাহিদা বেড়ে গেলে পণ্য খাতের জন্য নির্ধারিত ইঞ্জিনও সরিয়ে নেয়া হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। অনেক সময় কনটেইনার লোড করে ট্রেন প্রস্তুত থাকলেও ইঞ্জিনের অভাবে তা দীর্ঘ সময় স্টেশনে পড়ে থাকে। রেলওয়ের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন সরবরাহ না পাওয়ায় ব্যাহত হয় জরুরি আমদানি পণ্য পরিবহন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে যাত্রীসেবার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনকেও সমান গুরুত্ব দেয়। তবে অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগ সত্ত্বেও শুধু লোকোমোটিভের কারণে পণ্য খাতে চাহিদা অনুযায়ী সার্ভিস দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর পরও সংকটের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রফতানি কনটেইনার, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানিসহ সারা দেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি রেলপথে পরিবহন হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ধীরাশ্রমে কয়েক গুণ বাড়তি সক্ষমতার আইসিডি নির্মাণের পাশাপাশি মিটার গেজের জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে শতাধিক লোকোমোটিভ আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। আশা করি, আগামী দিনগুলোয় যাত্রীসেবার সঙ্গে পণ্য পরিবহনও রেলে সমান গুরুত্ব পাবে।’