রংপুর সিটি করপোরেশনসহ বিভাগের ১৫টি পৌরসভার কাছে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভাগের বকেয়া বিল বাবদ মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ৮২ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা পাওনা আছে রংপুর সিটি করপোরেশনের কাছে এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বকেয়া পাওনা আছে দিনাজপুর পৌরসভার কাছে ২১ কোটি ৮ লাখ টাকা। যার সিংহভাগ অনাদায়ী রয়েছে বছরের পর বছর। সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভাগুলো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় জনগণের ভোগান্তি হতে পারে—এমন বিবেচনায় বিদ্যুৎ বিভাগ এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানেও যেতে পারছে না।
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) রংপুর বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত রংপুর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বকেয়ার ১ কোটি ৩৩ লাখ এবং ১৫টি পৌরসভার পক্ষ থেকে ৬৮ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। এর পরও রংপুর সিটি ১৩০টি এবং পৌসভারগুলোর মোট ৩৩০টি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের (মিটার) বিপরীতে ডিসেম্বর পর্যন্ত বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৮২ কোটি ১৮ লাখ টাকা।এর মধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশনের কাছে বকেয়া ২৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। দিনাজপুর পৌরসভার কাছে বকেয়া ২১ কোটি ৮ লাখ টাকা। গাইবান্ধা, পলাশবাড়ী ও গোবিন্দগঞ্জ এবং কুড়িগ্রাম পৌরসভার কাছে মোট বকেয়ার পরিমাণ ১৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এছাড়া উল্লেখযোগ্য বকেয়া পার্বতীপুর পৌরসভার কাছে ৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা, পঞ্চগড় পৌরসভার কাছে ৩ কোটি ৬৪ লাখ, ঠাকুরগাঁও পৌরসভার কাছে ৩ কোটি ৬ লাখ ও সৈয়দপুর পৌরসভার কাছে ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভাগুলো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় দীর্ঘদিন বকেয়া বিদ্যুৎ বিল আদায় না হলেও কঠোর পদক্ষেপে যাওয়া সম্ভব হয় না। কারণ অধিকাংশ বিদ্যুৎ বিল বকেয়া আছে সড়ক বাতিসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার। তাই জনগণের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে সংযোগ সহজে বিচ্ছিন্ন করা হয় না। এ সুযোগ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এছাড়া বিদ্যুৎ অফিস থেকে প্রতি মাসে বিলের কাগজ দেয়া হলেও এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসে বিল পরিশোধ না করায় পরিস্থতি আরো জটিল হচ্ছে।’
বকেয়া বিল প্রসঙ্গে রংপুর সিটি করপোরেশনের সচিব উম্মে ফাতিমা বলেন, ‘বর্তমান মেয়রের আমলে কোনো বিদ্যুৎ বিল বাকি নেই। তবে বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের মধ্যে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার আগের পৌরসভারও বিল আছে। আমাদের মেয়র এ ব্যাপারে বেশ আন্তরিক। তাই বকেয়া বিদ্যুৎ পরিশোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
এদিকে দিনাজপুর পৌরসভার তিনবারের নির্বাচিত মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বকেয়া বিদ্যুৎ বিল প্রসঙ্গে বলেন, ‘২০১১ সালে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল বাবদ পৌনে ৫ কোটি টাকার দায় নিয়ে তিনি পৌরসভার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তার পৌরসভার মূল আয় নাগরিকের ট্যাক্সের টাকা। এ টাকা থেকে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেয়া সম্ভব হয় না। তার পরও প্রকল্প নেই বললেই চলে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভবন বাবদ ২০১২ সালের প্রথম দিকে বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে পৌরসভার প্রায় ৩৬ কোটি টাকা পাওনা হয়েছিল। এ বিষয়ে গঠিত কমিটি সত্যতাও পেয়েছে এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয় ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চিঠি চালাচালিও হয়েছে, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। এখন আমাদের পাওনা বৃদ্ধি পেয়েছে। তার পরও আমরা সাধ্যমতো বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছি।’ তবে তিনি অভিযাগ করেন বকেয়া বিলের মধ্যে ভূতুড়ে বিলও আছে।’
নেসকোর রংপুর বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, ‘বকেয়া বিদ্যুৎ বিল আদায়ে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত চিঠি দেয়া হয়। এছাড়া মৌখিকভাবেও অনুরোধ করা হয়। অনেকে দিচ্ছি-দেব বলে। আবার কেউ কেউ বিল রিভিউ করার কথা বলেন। কেউ কেউ দেন না, তা নয়। চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। তবে প্রতি মাসে কেউ দেন না। ’
২০১৬ সালের ১ অক্টোবর নেসকো রংপুর বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্ব নেয়। রংপুর বিভাগের আট জেলায় বিদ্যুতের গড় চাহিদা প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট। শীতে এ চাহিদা থাকে প্রায় সাড়ে ৫০০ মেগাওয়াট। তবে গ্রীষ্মকালে জমিতে সেচ এবং বিভিন্ন কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। গত ৪ মার্চ বিদ্যুতের চাহিদা হয়েছিল ৮১২ মেগাওয়াট। গত বছর জুলাই মাসে সর্বোচ্চ চাহিদা রেকর্ড করা হয়েছিল ৯৫০ মেগাওয়াট। এদিকে গত ডিসেম্বর থেকে গাইবান্দা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় স্থাপিত বেক্সিমকো গ্রুপের ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত ১৩০-১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রতিদিন গ্রিডে যোগ হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে। তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে লোডশেডি নেই বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।










