ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম। পেশায় চা দোকানি। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের পাশেই তার দোকান। দোকানজুড়ে উড়ছে মাছি। মাছির দিকে তাকিয়ে বললেন, ছয় মাস আগেও এখানে মাছি ছিল না। দোকানের পেছনে রাস্তার উল্টো পাশে আঙুল ইশারা করে দেখালেন। ক্ষোভ নিয়ে বললেন, যেদিন থেকে এখানে সিটি করপোরেশনের নির্দেশে ময়লা ফেলতে শুরু করেছে সেদিন থেকেই আমাদের দুর্ভোগ শুরু হয়েছে। মাছি-মশা-দুর্গন্ধে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।

শুধু ৫৮নং ওয়ার্ডই নয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন ১৮টি ওয়ার্ডেরই বর্জ্য সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। ৪ বছরেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি নতুন এই ওয়ার্ডগুলোতে।

২০১৭ সালের ২৬ জুলাই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে ঢাকা জেলার আটটি ইউনিয়ন ভেঙে মেগা সিটির অন্তর্ভুক্ত করে। গেজেটে বলা হয়, স্থানীয় সরকার আইন ২০০৯ মতে, ঢাকা জেলার শ্যামপুর, দনিয়া, মাতুয়াইল, সারুলিয়া, ডেমরা, মান্ডা, দক্ষিণগাঁও ও নাছিরাবাদকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৮ থেকে ৭৫নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত করা হলো। মেগা সিটির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের জনগণ আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। জনপ্রতিনিধিরাও একের পর এক উন্নয়নের আশ্বাস দিতে থাকেন জনগণকে। কিন্তু অতি জরুরি নাগরিক সেবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই গড়ে ওঠেনি ওয়ার্ডগুলোতে। এছাড়া গ্যাস, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পার্ক, খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার—এককথায় আধুনিক নাগরিক জীবনের সব ধরনের ছোঁয়া থেকেই বঞ্চিত রয়েছে ১৮ ওয়ার্ডের নাগরিকরা।

ডিএসসিসির ৬২নং ওয়ার্ডের কাজলা এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশেই রয়েছে আবর্জনার বিশাল স্তূপ। সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মাঝবয়সী এক মহিলা রাস্তার পাশেই কয়েকটি পলিথিনের ব্যাগভর্তি গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলে যান। ওই মহিলার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি পেশায় গৃহকর্মী। চার বাসায় কাজ করেন। কাজ শেষে বাসাগুলোর দৈনন্দিন বর্জ্য এখানে ফেলে যান। নিজের বাসার বর্জ্যও তিনি এখানেই ফেলেন বলে জানিয়েছেন।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশের এলাকা অর্থাৎ যাত্রাবাড়ী, কাজলা, শনির আখড়া, মাতুয়াইল মেডিকেল, চিটাগাং রোড এবং ডেমরা মহাসড়ক এলাকা নতুন ওয়ার্ডগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এসব এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে মানুষ রাস্তার পাশেই গৃহস্থালিসহ সব রকম বর্জ্য ফেলে রাখেন। দীর্ঘদিন বর্জ্য ফেলার কারণে এসব এলাকার অনেক জীবন্ত খাল-জলাশয় ও ড্রেনের প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া মহাসড়কের পাশে বর্জ্য ফেলে রাখার কারণে রাস্তায় চলাচল করতে এবং যানবাহনের জন্য অপেক্ষারত মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এসব এলাকায় মশা-মাছি ও দুর্গন্ধ অসহনীয় যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকেই সিটি করপোরেশন থেকে বিভিন্ন আশার বাণী শুনিয়ে আসছেন নগরপিতারা। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ৬২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ মোস্তাক আহমেদ বলেন, এসটিএস (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন) না থাকার কারণে বর্জ্য নিয়ে নানাভাবে ভুগতে হচ্ছে আমাদের। যেহেতু ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই, তাই জনগণ এখানে-সেখানে ময়লা ফেলে পরিবেশে নষ্ট করছেন।

৫৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. শফিকুর রহমান বলেন, আমরাও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যায় ভুগছি। আমার ওয়ার্ডে অবস্থিত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কে বর্জ্য পড়ে আছে। আমি সিটি করপোরেশনকে বলে তা অপসারণের ব্যবস্থা করব।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কাউন্সিলর বণিক বার্তাকে বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে বলা হয়েছে আপাতত অস্থায়ীভাবে কোনো এক জায়গায় ময়লা ফেলার জন্য। সিটি করপোরেশনের গাড়ি এসে ময়লা নিয়ে যাবে। কিন্তু সপ্তাহ চলে যায় এমনকি মাসও চলে যায় সিটি করপোরেশনের লোকজন কিংবা গাড়ি আসে না, ময়লাও নেয় না। ফলে দেখা যায়, অস্থায়ী ময়লা ফেলার জায়গা স্থায়ীভাবে আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়।

আরেকটি সমস্যার কথাও কাউন্সিলরদের সঙ্গে আলাপকালে উঠে আসে। নতুন ওয়ার্ডগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জনবল বাড়ানো হয়নি। ফলে দেখা যায় আগের লোকজন দিয়েই কাজ চালিয়ে নিচ্ছে সিটি করপোরেশন। একইভাবে নতুন যান-যন্ত্রও বাড়েনি। ফলে সুইপাররা তাদের নির্ধারিত কাজের পাশাপাশি নতুন ওয়ার্ডগুলোর বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব পালন করছেন। এ কারণে নতুন ওয়ার্ডগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যা দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন অন্তর্ভুক্ত নগরবাসীর।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, ১৮টি ওয়ার্ডসহ মোট চল্লিশটি ওয়ার্ডে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে। ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব ওয়ার্ডে এসটিএস নির্ধারণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ চলমান রয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যেই এসব ওয়ার্ডের বর্জ্য সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হয়ে যাবে।

ডিএসসিসির বর্জ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ শফিউল্লাহ সিদ্দিক ভুঁইয়া বলেন, ডিএসসিসির প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে ২০-২৫ টন বর্জ্য জমে। নতুন এসটিএসগুলো ৩৫ টন বর্জ্য ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ৪ হাজার ৫০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে সুবিশাল এসটিএস দেয়া হবে। আগামী জুন মাসের মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট কেটে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

চার বছরেও নতুন ওয়ার্ডগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি কেন? জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী বণিক বার্তাকে বলেন, এখনো অনেক ওয়ার্ডে গ্রামীণ পরিবেশ রয়ে গেছে। রাস্তাঘাট হয়নি এমন ওয়ার্ডও আছে। ওই সব ওয়ার্ডে সিটি করপোরেশনের গাড়ি যেতে পারছে না, তাই কোথাও কোথাও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যা দেখা দিয়েছে।