শিক্ষার্থীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য যে ফুটপাত উন্মুক্ত থাকার কথা, রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চারপাশে সেই জায়গাই দখল করে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী হকার্স মার্কেট। দোকান, পণ্যের স্তূপ ও ক্রেতাদের ভিড়ে সংকুচিত হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থী ও পথচারীদের চলাচলের পথ। বিশেষ করে স্কুল ছুটির সময়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড়ের সঙ্গে হকার ও ক্রেতাদের চাপ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। এতে একদিকে যেমন চলাচলে ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে বিঘ্নিত হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশও। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে এ চিত্র প্রকট হলেও রাজধানীর অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশেও ফুটপাত দখল করে দোকান বসানোর একই প্রবণতা দেখা যায়।
লক্ষ্মীবাজার এলাকায় সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা গভ. মুসলিম হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরজমিনে এসব প্রতিষ্ঠানের আশপাশের সড়ক ও ফুটপাত ঘুরে দেখা যায়, কাপড়, জুতা, খাবারসহ নানা পণ্যের অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। দোকানের সামনে পণ্যের স্তূপ ও ক্রেতাদের ভিড়ে অনেক জায়গায় ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিক চলাচলের সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে পথচারীদের সড়কের পাশ দিয়ে চলতে হচ্ছে।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্কুল ছুটির সময়ে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি জটিল হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড়ের সঙ্গে হকার, ক্রেতা, রিকশা, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চাপ যুক্ত হওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। তবে হাতের কাছে তুলনামূলক কম দামে প্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া যায় বলে অনেক অভিভাবক এসব দোকান থেকে কেনাকাটাও করেন। একই কারণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এসব দোকানের চাহিদা রয়েছে। তাদের ভাষ্য, ক্যাম্পাসের পাশেই কম দামে পোশাকসহ প্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া যায়; দূরের মার্কেটে গেলে অতিরিক্ত সময় ও যাতায়াত খরচ হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শিক্ষার্থী রিচি সুমাইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখান থেকে আগেও জামাকাপড় কিনেছি। ক্যাম্পাসে যাতায়াত ও টিউশন পড়াতে গেলে অনেক পোশাকের প্রয়োজন হয়। তাই সবসময় দামি কাপড় না কিনে স্বল্পমূল্যের পোশাক কিনি।’ তবে ফুটপাত চলাচলের জায়গা হওয়ায় স্কুলের পাশে এভাবে দোকান বসানোকে যৌক্তিক মনে করেন না তিনি। তার মতে, ‘ফুটপাত তো চলাচলের জায়গা। স্কুলের পাশে দোকান বসানোয় ছোট শিক্ষার্থীদের ওপরও খারাপ প্রভাব পড়ে। কিন্তু এগুলো সরানো আমাদের হাতে নেই।’
হকারদের ভাষ্য, জীবিকার তাগিদেই তারা এসব এলাকায় ব্যবসা করছেন। তাদের দাবি, বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করে স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করা হলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। শিশুদের পোশাক বিক্রেতা মাজেদ আলী বলেন, ‘কোথাও জায়গা না পেয়ে স্কুলের পাশে বসি। দোকান দেয়ার জায়গা পেলে তো সেখানেই যাইতাম। এখানেও বেচাকেনা ভালো হয়। ভার্সিটি-কলেজের ছাত্রীরা আসে, স্কুলের গার্ডিয়ানরাও ছুটির পর কেনাকাটা করে।’
শিক্ষা কেন্দ্রের আশপাশে এমন কোনো কার্যক্রম রাখা উচিত নয়, যা শব্দদূষণ বা অন্য কোনোভাবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে বাজার, হকার ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম থাকলে শিক্ষার্থীদের চলাচল ও শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হতে পারে। স্কুলের জন্য মিশ্র ভূমি ব্যবহার অনুমোদিত হলেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—এমন কোনো কার্যক্রম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে থাকা উচিত নয়।’ দীর্ঘদিন একই ধরনের পরিবেশে বসবাস করলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সহনশীলতা তৈরি হয়। ফলে ফুটপাত দখল বা অনিয়মও একসময় স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। এ কারণে শুধু দখলমুক্ত করাই নয়, নাগরিকদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
তবে ফুটপাত ও সড়কের জায়গা দখল করে দোকান বসানো যাবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম। মঙ্গলবার রাজধানীর ফকিরাপুল, দৈনিক বাংলা ও মতিঝিল বক চত্বর এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সড়ক ও ফুটপাত জনসাধারণের চলাচলের জন্য। এগুলো দখল করে ব্যবসা পরিচালনা কিংবা মালামাল রাখার সুযোগ দেয়া হবে না। নির্দেশ অমান্য করলে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’










