তিনদিনের বাংলাদেশ সফর শেষে এসব কথা বলেছেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট। সফরে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তার সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সফর শেষে ঢাকা ত্যাগ করার আগে এক বিবৃতিতে জোহানেস জাট বলেন, ‘বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগের মতো বিষয়গুলোকে সরকার উচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকও এ প্রতিশ্রুতিতে অংশীদার। এ প্রেক্ষাপটে আমরা বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরিতে সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সমর্থন ও আরো জোরদার করার চেষ্টা করছি।’
জাট বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করেছে; কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। অর্থাৎ কর্মক্ষম তরুণদের প্রায় অর্ধেকই চাকরি পায়নি। কর্মসংস্থানে বিশেষভাবে তরুণীরা বেশি বাধার মুখে পড়ে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়ার প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে যে মৌলিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা দূর করতে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের সংস্কার জরুরি।
বিশ্বব্যাংক বলছে, তারা এমন অর্থনীতি গড়ে তুলতে দেশগুলোকে সহায়তা করছে, যেখানে প্রবৃদ্ধি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানে রূপ নেয়। উন্নত দেশ থেকে কাজ সরিয়ে নয়, বরং যেখানে মানুষ বসবাস করে সেখানেই সুযোগ সৃষ্টি করার সহায়তা করছে তারা। বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে ভৌত ও মানবসম্পদ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগেও কাজ করছে সংস্থাটি।
স্বাধীনতার পর থেকেই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম। এ পর্যন্ত সংস্থাটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) অর্থায়নের মাধ্যমে অনুদান, সুদমুক্ত ঋণ ও স্বল্পসুদে ঋণ হিসেবে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে সহায়তা করছে।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য-উপাত্তেও দেশের তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, ২০২৪ সালে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ২০ হাজার। এর মধ্যে দেশে যত বেকার আছে, তাদের সাড়ে ১৩ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী। ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ বেকার উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন। এর মানে হলো, প্রতি পাঁচজন বেকারের একজন ব্যক্তি স্নাতক ডিগ্রিধারী কিংবা উচ্চ মাধ্যমিক সনদধারী। যাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তারা সবচেয়ে কম বেকার। বেকারের মধ্যে মাত্র সোয়া ১ শতাংশ এমন ব্যক্তি আছেন। ১৫-২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকার সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। দেশে যত বেকার আছে, এর মধ্যে ৭৬ শতাংশের বয়স ১৫-২৯ বছর। এছাড়া এ বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি ৮ শতাংশের বেশি। বেকার তরুণদের (১৫-২৯ বছর বয়সী) প্রায় ২৯ শতাংশের মতো স্নাতক ডিগ্রিধারী। এর মানে, স্নাতক ডিগ্রিধারীদের তিনজনে একজনের মতো বেকার।
বাংলাদেশের বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থাকলেও তাদের কার্যকরভাবে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়নি। বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। যদিও রফতানি আয়ের দিক থেকে বৈশ্বিক তালিকায় অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যার দিক থেকে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে বার্ষিক রফতানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারের নিচে কেবল তিনটি দেশের, যার অন্যতম বাংলাদেশ। অন্য দেশ দুটি হলো পাকিস্তান ও নাইজেরিয়া। এমনকি এশিয়ার উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশ এখনো রফতানিতে বেশ পিছিয়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তিমত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হলো রফতানি। বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোয় রফতানির অবদানও বেশ বড়। এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলোও রফতানির দিক থেকে এখন বেশ ভালো অবস্থানে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও জনগোষ্ঠীর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এসব দেশ এখন নিজ নিজ রফতানিকে সমৃদ্ধ করছে। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত তৈরি পোশাক রফতানিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেলেও সার্বিক রফতানির পরিমাণ খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। মূলত নীতি দুর্বলতা ও বড় জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারার কারণেই এ খাতে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব হলে রফতানি বাড়ার পাশাপাশি তা বেকারের সংখ্যা কমানোর ক্ষেত্রেও অবদান রাখত।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহারেও দেশে বেকারের সংখ্যা বিশেষ করে স্নাতক ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিত বেকারদের বিষয়টি উল্লেখ করে কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার দেয়ার মাধ্যমে কর্মক্ষম যুব জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা, বাজারভিত্তিক দক্ষতা ও কর্মসংস্থান এবং ব্যাপক কর্মমুখী কর্মসূচি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব হ্রাস করা বর্তমান বাস্তবতায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত এক দশকে বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। শিল্পখাতে প্রত্যাশিত হারে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি না হওয়া, দক্ষতার ঘাটতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে অনেক তরুণ উপযুক্ত কাজ পাচ্ছে না। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার যথেষ্ট সমন্বয় না থাকায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে, যা সমস্যাটিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
তবে সরকার নির্বাচনী ইশতাহার অনুযায়ী নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্ব দিলে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হতে পারে উল্লেখ করে ড. সেলিম রায়হান আরো বলেন, যদিও তা সহজ হবে না। এজন্য শিল্পায়ন বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, প্রযুক্তি ও আইটি খাতে বিনিয়োগ এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ধীরে ধীরে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং তরুণদের বেকারত্ব কমানো সম্ভব হবে।










