দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে অবৈতনিক সেবা কাজের আর্থিক মূল্যায়ন প্রথাগত হিসাবের বাইরে থাকলেও টাকার অংকে এর পরিমাণ অত্যন্ত বিশাল। দেশে অবৈতনিক গৃহস্থালি ও সেবা কাজের বার্ষিক আর্থিক মূল্য প্রায় ৬ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন বা ৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এ বিশাল মূল্যের সিংহভাগ বা প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে নারীর শ্রম থেকে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রবর্তিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ‘হাউসহোল্ড প্রোডাকশন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টস’ (এইচপিএসএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, এ বিপুল অংক দেশের মোট জিডিপি’র প্রায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) আয়োজিত সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে উঠে আসে এসব তথ্য।

বুধবার (৪ মার্চ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে 'টাইম ফর চেঞ্জ: এনগেজিং ইয়ুথ টু ট্রান্সফর্ম আনপেইড কেয়ার নর্মস' শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এমজেএফ’র ডিরেক্টর (রাইটস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স প্রোগ্রাম) বনশ্রী মিত্র নিয়োগী।

মূল প্রবন্ধের ‘টাইম ইউজ সার্ভে ২০২১’-এর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ৫ দশমিক ৮ ঘণ্টা অবৈতনিক কাজে ব্যয় করেন, যেখানে পুরুষের ব্যয় মাত্র দশমিক ৮ ঘণ্টা। অর্থাৎ পুরুষদের তুলনায় প্রায় ৭ গুণ বেশি সময় দিয়ে নারীরা এ অদৃশ্য অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন। অবেতনিক এ শ্রমের স্বীকৃতি এবং পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কাজের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এখন টেকসই উন্নয়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

এ বিশাল শ্রম বৈষম্যের পেছনে প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি বা ‘সোশ্যাল নর্মস’-কে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, সমাজে প্রচলিত বর্ণনামূলক, আদেশমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিক—এ তিন ধরনের রীতিনীতি নারীর ওপর ঘরোয়া কাজের বোঝা চাপিয়ে দেয়। সমাজ ও পরিবার এখনো মনে করে ঘরের কাজ কেবল নারীরই দায়িত্ব, যা নারীর শিক্ষা, ক্যারিয়ার এবং নেতৃত্বের সুযোগকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এ 'সময় দারিদ্র্য' নারী ও পুরুষের মধ্যে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে রেখেছে, যা নিরসন করা না গেলে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সংকট উত্তরণে নারীর কাজের স্বীকৃতি, কাজের বোঝা কমানো এবং পুনর্বণ্টনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঘরোয়া সেবা কাজকে ব্যক্তিগত কাজের বদলে রাষ্ট্রের ‘সামাজিক অবকাঠামো’ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, শিশু ও প্রবীণ যত্ন কেন্দ্র এবং সহজলভ্য পানি ও জ্বালানি ব্যবস্থা নারীর কাজের বোঝা কমাতে পারে।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। নারীর অবৈতনিক শ্রমের বোঝা ও এর প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, অবৈতনিক কাজের চাপে নারীর নিজের জন্য কোনো সময় থাকে না, যা তার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা বা অ্যাম্বিশন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা গৃহস্থালি কাজের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন চাই।

নারীর কাজের মূল্যায়ন নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকে প্রশ্ন করেন—আমরা কি বাচ্চাদের দেখা-শোনার জন্য টাকা দাবি করছি? আমরা আসলে এ ভুল ধারণা বা মিসকনসেপশন থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আমরা মূলত নারীর কাজের সম্মান, স্বীকৃতি ও মর্যাদার কথা বলছি। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে এ কাজগুলো যে কতটা মূল্যবান, তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে।

ইউএন উইমেনের সহায়তায় এ জরিপের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে যে জিডিপিতে নারীর এ কাজের মূল্য ঠিক কত হতে পারে। মূল জিডিপিতে এটি এখনই অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলেও একটি ‘স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ তৈরির প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমেই নারীর কাজের বিশাল আর্থিক মূল্য আলাদাভাবে তুলে ধরা সম্ভব।

অনুষ্ঠানে মূকাভিনয়ের মাধ্যমে অসম শ্রমবণ্টনের শারীরিক ও মানসিক প্রভাব এবং সমান অংশগ্রহণের ইতিবাচক পরিবর্তন তুলে ধরা হয়। এছাড়া “রিকোগনাইজিং আনপেইড কেয়ার ওয়ার্ক' শীর্ষক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। সেমিনারের সমাপনী পর্বে “চিরচেনা বৃত্তের বাইরে পুরুষ”শীর্ষক ফটো ও আর্ট প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়।

সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিআরডি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. মোখলেসুর রহমানের সঞ্চালনায় দ্বিতীয় প্লেনারি অধিবেশনে সামাজিকভাবে নির্মিত পুরুষত্বের প্রথাগত ধারণা পুনর্বিবেচনার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। এ সময় ছিলেন বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক ড. অতনু রাব্বানি, ইউএন উইমেন-এর প্রোগ্রাম বিশ্লেষক কাজী রাবেয়া এমি, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উপ-পরিচালক আসমা আখতার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন মুজাহিদ মাহিসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।