ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে বরগুনাগামী লঞ্চ এমভি অভিযানে অগ্নিকাণ্ডের এক বছর আজ।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নৌ-অগ্নিকাণ্ডের দুঃসহ
বিভীষিকাময় স্মৃতির সাক্ষী হয়ে আছে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদী পাড়ের দিয়াকুল গ্রাম।
অগ্নিকাণ্ডে ৪৭ জনের প্রাণহানি আর অসংখ্য লঞ্চযাত্রীর দগ্ধ হওয়ার সেই ভয়াল স্মৃতি
মনে করে আজও আঁতকে ওঠেন ঝালকাঠিবাসী।
গত বছরের এদিনে গভীর রাতে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের এক বছর
পার হলেও নিখোঁজ ১৬ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। এখনো মেলেনি তাদের ডিএনএ রিপোর্ট।
একের পর এক নৌযানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও ঢাকা-বরিশাল রুটে নৌ-ফায়ার স্টেশন স্থাপন করা
হয়নি।
জানা যায়, ২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর
রাতে ঢাকার সদরঘাট থেকে ছয় শতাধিক যাত্রী নিয়ে বরগুনার উদ্দেশে ছেড়ে আসে অভিযান-১০ লঞ্চ। রাত ৩টার দিকে লঞ্চটি ঝালকাঠির সুগন্ধা ও বিষখালী
নদীর মোহনায় এলে ইঞ্জিন বিস্ফোরিত হয়। এতে পুরো লঞ্চে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে ২
ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নদীর মধ্যে পুরো লঞ্চ জ্বলছিল। পরে ভাসতে ভাসতে দিয়াকুল
এলাকার চরে আটকা পড়ে লঞ্চটি। ততক্ষণে অনেকেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। জীবন বাঁচাতে
কেউ কেউ নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ ঘটনায় ৩৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে নদী থেকে
চারজনের মরদেহ উদ্ধার এবং হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় আরো ছয়জনের মৃত্যু হয়।
লঞ্চ ও নদী থেকে অগ্নিদগ্ধদের উদ্ধার এবং তাদের আশ্রয় ও সেবা দিয়ে মানবতার
দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন দিয়াকুল গ্রাম ও ঝালকাঠি লঞ্চঘাট এলাকার লোকজন। সেই রাতের
কথা স্মরণ করে আজও শিউরে ওঠেন দিয়াকুল গ্রামবাসী।
এ ঘটনায় স্বজনহারা মনির হোসেন নামে এক ব্যক্তি গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর ঝালকাঠি
থানায় লঞ্চের মালিকসহ আটজনের নামে মামলা করেন। আসামিরা হলেন লঞ্চের মালিক হামজালাল
শেখ, দুই মাস্টার রিয়াজ সিকদার ও মো. খলিল,
দুই চালক মাসুম
ও কালাম, সুপারভাইজার আনোয়ার, সুকানি আহসান ও কেরানি কামরুল।
এ ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে, অন্যটি নৌ-মন্ত্রণালয়ের। দুটি তদন্ত
কমিটিই লঞ্চের ইঞ্জিন কক্ষে বিস্ফোরণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে রিপোর্ট দেয়।
এজন্য লঞ্চের মালিক ও স্টাফদের দায়ী করা হয়েছিল। এদিকে গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি
মামলাটি নৌ-আদালতে হস্তান্তর করা হয়।
পোড়া লঞ্চটি আদালত মালিক পক্ষের জিম্মায় দেন।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের
(সিআইডি) তথ্য মতে,
নিখোঁজদের জন্য
৫১ জন স্বজন ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন। এক বছরেও শেষ হয়নি ডিএনএ পরীক্ষা। বরগুনার
গণকবরে দাফন করা হয়েছে ২৩ জনের মরদেহ। লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পার হলেও নিখোঁজ
১৬ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। এখনো মেলেনি তাদের ডিএনএ রিপোর্ট। ওই রিপোর্ট পেলে
তাদের পরিচয় শনাক্ত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
নদীতীরের বাসিন্দারা জানান,
গুরুত্বপূর্ণ এ
নৌ-রুট দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করে যাত্রীবাহী লঞ্চ ও
পণ্যবাহী জাহাজ। খুলনা ও মোংলায় যাওয়ার জন্য কৃত্রিম একটি চ্যানেল রয়েছে এখানে।
তাই অবিলম্বে সুগন্ধা নদীতীরে একটি নৌ-ফায়ার স্টেশন নির্মাণের
দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার দিয়াকুল গ্রামের বাসিন্দা ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যাত্রীদের
উদ্ধারকারী শিরিন আক্তার বলেন,
‘সেদিনের ভয়াল
ঘটনা এখনো চোখের সামনে ভাসে। আমাদের বাড়ির পুরুষ লোকেরা সবাই সেদিন নদীতে ঝাঁপিয়ে
পড়ে উদ্ধারকাজে অংশ নেন। আর নারীরা তাদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে কাপড় দিয়ে সহযোগিতা
করি। সে কথা এখনো মনে পড়লে চোখে পানি এসে যায়।’
ঝালকাঠি লঞ্চঘাট এলাকার মিলন মাঝি বলেন,
‘আমি লঞ্চে আগুন
জ্বলতে দেখে নৌকা নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে অসংখ্য মানুষকে বিনামূল্যে পার করে দিয়েছি।
অগ্নিদগ্ধদের চিকিত্সার জন্য দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করেছি। এজন্য অনেকেই
আমাকে পরবর্তী সময়ে সহযোগিতা করেছেন।’
ঝালকাঠি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সুগন্ধা নদীতীরের বাসিন্দা
হুমায়ুন কবির সাগর বলেন, ‘জরুরি ভিত্তিতে লঞ্চঘাট
এলাকায় একটি নৌ-ফায়ার স্টেশন নির্মাণ
প্রয়োজন।’
ঝালকাঠি ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর ঊর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষের কাছে নৌ-ফায়ার স্টেশনের জন্য আবেদন
করেছি, কিন্তু এক বছর পার হলেও তা
বাস্তবায়িত হয়নি।’
ঝালকাঠি থানার এসআই নজরুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি মামলা ঢাকার নৌ-আদালতে চলমান রয়েছে। আমি প্রাথমিকভাবে মামলাটি তদন্ত করেছি, আলামতও জব্দ করেছি। আদালতের নির্দেশে পোড়া লঞ্চটি মালিক পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এক বছর হলেও আমরা এখনো ১৬ জনের ডিএনএ রিপোর্ট পাইনি।










