সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগের আইনকানুন সহজ করেছে। নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে শুরু হয়েছে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ। এত কর্মযজ্ঞের পরও দেশে কাঙ্ক্ষিত হারে বিদেশী বিনিয়োগ আসছে না। বার্ষিক প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহ এখনো মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশের নিচে। এক দশক ধরেই এটি অতিক্রম করতে পারছে না বাংলাদেশ।
বিদেশী বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটাতে দেরি হচ্ছে কেন? এমন প্রশ্নে বিশ্লেষকরা বলছেন, এর অন্যতম কারণ এখানে বিনিয়োগ আকর্ষণে নেয়া অনেক ধরনের উদ্যোগই এখনো দৃশ্যমান হয়নি। মানুষ সহজাতভাবে চোখে দেখেই বিশ্বাস করে, কিন্তু এখানে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো সেভাবে দৃশ্যমান নয় বলে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হচ্ছেন না। এছাড়া দেশের ভাবমূর্তি সংকট, আমলতান্ত্রিক জটিলতা, লজিস্টিক সমস্যাও কাঙ্ক্ষিত হারে এফডিআই প্রবাহ না আসার অন্যতম কারণ।
কয়েক বছর ধরে ঈর্ষণীয় হারে বাড়ছে প্রবৃদ্ধি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। আর জিডিপির আকার ছিল প্রায় ২৫ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এই জিডিপিতে এফডিআইয়ের অংশ মাত্র এখনো ১ শতাংশ অতিক্রম করতে পারেনি।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে নমিনাল জিডিপিতে এফডিআইয়ের অংশ ছিল শূন্য দশমিক ৭০২ শতাংশ। পরের অর্থবছর তা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৯৯১ শতাংশ। নমিনাল জিডিপিতে এফডিআইয়ের অংশ ছিল ২০১২-১৩ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৯৬৫ শতাংশ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৮৬৪ শতাংশ, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৯৪০ শতাংশ, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৯০৫ শতাংশ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৯৮২ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৭০০ শতাংশ এবং সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৮৭৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ এফডিআই প্রবাহ জিডিপির ১ শতাংশ অতিক্রম করতে না পারলেও প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামে তা জিডিপির ৬ শতাংশেরও বেশি। যদিও বাংলাদেশের মতো সস্তা শ্রম ও সরকারি সুবিধা দেখিয়ে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে দেশটি। এক্ষেত্রে তারা সফলতাও দেখতে শুরু করেছে। বর্তমানে ফোর্ড আর টয়োটা মোটরসের মতো প্রতিষ্ঠানের কারখানা রয়েছে ভিয়েতনামে। এছাড়া ইন্টেল ও স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করছে সেখানে। প্রতিবেশী দেশ ভারতও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে সফলতা দেখিয়েছে। অ্যামাজন, ওয়ালমার্টসহ বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে বিনিয়োগ করেছে। অথচ বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে আকর্ষণীয় বললেও এখনো অনেক বড় বিনিয়োগকারীই তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করেননি। ২০০৮ সাল থেকে দুই দফায় সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করেও বিদেশী কোম্পানিকে আনা যায়নি।
বাংলাদেশে অনেক বিদেশী বিনিয়োগকারী আসছেন বা আসবেন—বিভিন্ন সময়েই এমন তথ্য দিয়ে আসছে বিনিয়োগের পোষক কর্তৃপক্ষগুলো। কিন্তু কখন থেকে শিল্পগুলো হবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। এখনই যদি কোনো শিল্প স্থাপন শুরু হয়, তা দৃশ্যমান হতে এক-দুই বছর সময় লাগবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর কথা বিবেচনায় নিলে ২০২২-২৩ সালের মধ্যে অনেক অগ্রগতি দেখা যাবে বলে আশা করা যায়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা মোটা দাগে দৃশ্যমান হতে আরো দু-এক বছর লেগে যাবে।
শুধু অবকাঠামো থাকলে হয় না, বিনিয়োগ আকর্ষণে ভাবমূর্তিও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিনিয়োগকারীদের দাবি, দেশের বাইরে বাংলাদেশেরও ভাবমূর্তি সংকটটা এখনো কাটেনি। বাংলাদেশে আইন ও নীতির কোনো ধারাবাহিকতা নেই। এগুলো খুব দ্রুতই পরিবর্তন হয়। এটাও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের মতে, ভাবমূর্তি বাড়াতে অনেক প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রণয়নের পাশাপাশি অতিরিক্ত সুবিধাও দিতে হবে।
ফরেন ইনভেস্টর্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, একটা দেশে এফডিআই প্রবাহ যখন আসে, তখন বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে তুলনামূলক অবস্থান বিবেচনা করেই আসে। সব দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থান নিশ্চিত করেই এফডিআই আসে। কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় আমরা পিছিয়ে আছি। যেমন চীন থেকে আমাদের এখানে বিনিয়োগ আসছে না, কিন্তু ভিয়েতনামে ঠিকই যাচ্ছে। তাদের কর কাঠামো বা অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত বলেই এমনটা হচ্ছে।
তার মতে, বিশ্বের অনেক দেশে আইন কখনো দ্রুত পরিবর্তন হয় না, যেটা বাংলাদেশে হয়। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্র আমাদের আছে, কিন্তু প্রতিযোগী দেশের তুলনায় আমরা আকর্ষণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছি। এখানে নীতির ধারাবাহিকতা না থাকার ফলে অন্যান্য দেশ আমাদের পেছনে ফেলে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাচ্ছে। ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি আমাদের আইনি কাঠামো টেকসই ও নির্ঝঞ্ঝাট করা প্রয়োজন।
ভৌত অবকাঠামো সমস্যা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, আইন ও নীতির অস্থিতিশীলতার পাশাপাশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার আরো একটি বড় কারণ লজিস্টিক সমস্যা। লজিস্টিকে উচ্চব্যয়ের কারণে এখানে পণ্যের দাম বেশি পড়ছে, ব্যবসার মুনাফাও কমছে। আবার লজিস্টিক সময়ও বাংলাদেশে বেশি লাগে। যানজটের কারণে এখানে একটি ট্রাক গড়ে ঘণ্টায় মাত্র ১৭ কিলোমিটার যেতে পারে। এ গতিতে চট্টগ্রামে পৌঁছার পর তা রফতানি গন্তব্যে পৌঁছতেও সময় বেশি লাগে। বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমা দেশে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে ২১ দিন লাগলেও ভিয়েতনাম বা মিয়ানমার থেকে পণ্য পরিবহনে সময় লাগে ৭-১০ দিন।
ভৌত অবকাঠামোগত ঘাটতির পাশাপাশি বিনিয়োগের সার্বিক পরিবেশে ব্যাপক অস্বস্তি, অস্বচ্ছতা ও বিভ্রান্তিও রয়েছে বাংলাদেশে। এ কারণে অনেক ধরনের সক্ষমতায় এগিয়ে থাকলেও দেশে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে বিনিয়োগ আসছে না বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
তারা বলছেন, বাংলাদেশ এখনো ইমেজ সংকট দূর করতে ব্যস্ত। এখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা না থাকলেও জমি সমস্যার পাশাপাশি ওয়ান স্টপ ফ্যাসিলিটির অকার্যকারিতার মতো সমস্যা রয়ে গেছে। যোগাযোগ ও অন্যান্য অবকাঠামো সমস্যা তো রয়েছেই। ভালো বা খারাপ না, এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।
এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, রাস্তা তৈরি করা শুরু হয়েছে, এখনো শেষ হয়নি। পরিবহন চলার জন্য রাস্তাটা সম্পন্ন হচ্ছে। বিদেশীরা যাতে অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন করতে পারে, সেজন্য আইন সংশোধন করা হয়েছে। এরপর অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে জাপান থেকে প্রতিষ্ঠান এসেছে, চীন থেকেও এসেছে, ভারত থেকেও এসেছে। জাপানিরা এরই মধ্যে তাদের অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে। আশা করছি, আগামী বছরের শেষের দিকে শিল্প স্থাপনের উপযোগী হবে। এদিকে মিরসরাইয়ে ভারতীয় বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে আদানির কাজ শেষ হতে এখনো বেশ সময় লাগবে। চীনেরটা আশা করছি এ বছরের শেষের দিকে শিল্প স্থাপনের উপযোগী হবে। শিল্পায়নটা সবসময়ই কিছুটা সময়সাপেক্ষ বিষয়। এখন স্বাভাবিক উন্নতি হচ্ছে। আরো অনেক উন্নতি দৃশ্যমান হতে এক-দুই বছর লাগবে।
একই কথা বলছে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (বিডা)। তারা বলছে, যেকোনো শিল্প হতে সময় প্রয়োজন দুই-তিন বছর। এ বছর যে বিনিয়োগ নিবন্ধনের তথ্য আমরা পাচ্ছি, সেগুলো বাস্তবায়নে দুই-তিন বছর লাগবে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হতে দুই-তিন বছর লেগে যাবে। পোশাক খাত উন্নয়নে যে ধরনের উদ্ভাবনী নীতি তৈরির পারদর্শিতা দেখিয়েছি, সেই পারদর্শিতা অন্য খাতে ছড়িয়ে দেয়া যায়নি। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারের বর্তমান নীতি ও উন্নয়ন দর্শনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে আমরা বিনিয়োগসহ সব ক্ষেত্রে আরো এগিয়ে যেতে পারব।
বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহে একটা বড় উল্লম্ফন হয়েছিল ২০১৮ সালে। জাপানের জে টি গ্রুপ কর্তৃক বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানের তামাক ব্যবসা অধিগ্রহণের প্রভাবে ওই বছর এফডিআই প্রবাহ বেড়ে যায় ৬৮ শতাংশ। কিন্তু পরের বছর বড় ধরনের অধিগ্রহণ, নতুন বিনিয়োগ বা বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা পুনরায় বড় ধরনের বিনিয়োগ করেননি। ফলে ২০১৯ সালে বিদেশী বিনিয়োগ প্রবাহ কমে গেছে ব্যাপক হারে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ ৬ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সংস্থা আঙ্কটাড।
সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি ও শিল্প বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যবসা সহজীকরণে সরকার নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এগুলোর সুফল আসতে কিছুটা সময় লাগবে। ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানে উন্নতি ঘটাতে আমরা বহু সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছি, বাস্তবায়ন করেছি। আগামী অক্টোবরে এর প্রতিফলন দেখা যাবে বলে আমরা আশাবাদী। বেজা যেসব অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে, সেখানে বিনিয়োগের জন্য অসংখ্য প্রস্তাব আমরা প্রতিনিয়ত পাচ্ছি। এগুলো শিগগিরই বাস্তবায়ন হতে থাকবে। ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি আর অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা স্থাপন পূর্ণোদ্যমে শুরু হলে নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।









