পুনঃসংস্কারের সাত বছরেও গৃহকর নিয়ে সংকট সমাধান করতে পারেনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। সদ্যবিদায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা কম আদায় হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৭ শতাংশ কম। প্রতি বছর প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকলেও সর্বশেষ অর্থবছরে গৃহকর আদায় কমে যাওয়ার কারণ হিসাবে বর্ধিত কর নির্ধারণকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চসিকের রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ অর্থবছরের মধ্যে গৃহকর আদায় কম হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। এমনকি করোনা মহামারীর সময়েও পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে বেশি গৃহকর আদায় হয়েছিল। মূলত গৃহকর নির্ধারণের সময় থেকেই নগরবাসীর আপত্তি, চসিকের অভ্যন্তরেই কর নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের অনিয়ম, গৃহকর নির্ধারণ নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে কর আদায় ও সংকট সমাধানকে জটিল করে তুলেছে। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে চসিকের পৌরকর আদায়সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এ চিত্র উঠে এসেছে।
চসিক ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গৃহকর আদায় করেছে ১৮৬ কোটি ৯৩ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। অথচ এর আগের বছর এই সময়ে আদায় হয়েছিল ১৯৩ কোটি ৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে গৃহকর আদায় কমেছে ৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
এদিকে নির্ধারিত করের চেয়ে বেশি নির্ধারণ, গৃহকর নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদ দীর্ঘদিন ধারাবাহিক আন্দোলন করে আসছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, সেবা খাতে ব্যর্থ হয়ে চসিক নগরবাসীর ওপর অযৌক্তিক করহার চাপিয়ে দিতে চাইছে। এজন্য গৃহ মালিকরা কর দিতে নিরুৎসাহিত হয়েছে বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের।
চসিকের আয়ের বড় খাত গৃহকর। মূলত দুটি কারণে গৃহকর আদায় কম হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, বর্ধিত গৃহকর বাতিল দাবিতে আন্দোলনের কারণে মানুষ গৃহকর দিয়েছে কম। আর চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া, পুনঃকর নির্ধারণের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে আরো কম গৃহকর দেয়ার আশায় মানুষ অপেক্ষা করছে। এক্ষেত্রে ন্যায্য গৃহকর নির্ধারণের দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা।
চসিকের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সময়ে স্থাপনার আয়তনের পরিবর্তে ভাড়ার ভিত্তিতে গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে গৃহকর আগের চেয়ে সর্বোচ্চ ২০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। ভাড়ার ভিত্তিতে গৃহকর নির্ধারণের ঘটনায় বাড়ির মালিকদের সংগঠন চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদ আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের মুখে ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর গৃহকর নির্ধারণের নতুন পদ্ধতি স্থগিত করেছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
চসিকের বর্তমান মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী দায়িত্ব নেয়ার পর এই স্থগিতাদেশ তুলে নেয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের জুলাই থেকে নতুন করে গৃহকর আদায় কার্যক্রম শুরু করে চসিক। এরই মধ্যে অভিযোগের ভিত্তিতে গৃহকর নির্ধারণ যৌক্তিক করা হয়েছে বলে দাবি করা হয় চসিকের পক্ষ থেকে। তবে গৃহকর আদায় শুরু হলে ফের আন্দোলনে নামে করদাতা সুরক্ষা পরিষদ। ১৫ মার্চ নগর ভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালনকালে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় চসিক মেয়রের অনুসারীদের হামলায় পাঁচ আন্দোলনকারী আহত হন।
গৃহকর আদায় কম হওয়ার কারণ হিসাবে করদাতা সুরক্ষা পরিষদের আন্দোলন ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের কারণে গৃহকরের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রচারণা ছিল। চসিক দীর্ঘ সময় নিয়ে এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে আপত্তি থাকা নির্ধারিত গৃহকর পুনর্মূল্যায়ন করেছে। এর পরও গৃহকর আদায় কম হওয়ায় বিষয়টি যৌক্তিক সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে।’
চসিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরে গৃহকর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৩৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ১৮৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম নগরীর সরকারি-বেসরকারি হোল্ডিং রয়েছে ২ লাখ ৬ হাজার ৯৭৫টি। এর মধ্যে সরকারি ১ হাজার ৫১৬ হোল্ডিংয়ের বিপরীতে সিটি করপোরেশনের গৃহকর আদায়ের লক্ষ্য ছিল ২৩৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ৯১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বা ৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ১৬২ কোটি ৮১ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে আদায় হয়েছে ৯৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বা ৫৮ শতাংশ।
যদিও সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নেতিবাচক প্রচারণার পাশাপাশি বিরূপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও গৃহকর আদায় কার্যক্রমে সিটি করপোরেশন পিছিয়ে পড়েছে। তাদের দাবি, করোনা পরিস্থিতি উন্নতির পরপরই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ডলার সংকট ও আমদানি সংকটে মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের মধ্যে নগদ অর্থ প্রবাহ কম। নির্মাণ উপকরণের দাম বাড়ার কারণে নতুন গৃহকর বাবদ আয় কমেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় কমিয়ে দেয়ার কারণে সরকারি খাতেও বরাদ্দ এসেছে অন্যান্য বছরের তুলনায় কম। এ কারণে সার্বিকভাবে গৃহকর আদায় কম হয়েছে। আপত্তিগুলো আমলে নিয়ে পুনর্মূল্যায়ন ছাড়াও অভিযোগ থাকা হোল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ পর্যালোচনা করা হলে গৃহকর আদায় চলতি অর্থবছরে বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
তবে প্রতিবেদন অনুযায়ী, গৃহকর আদায় কমলেও ট্রেড লাইসেন্স, ভূমি হস্তান্তর, বিজ্ঞাপন কর আদায় বেড়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে ট্রেড লাইসেন্স খাতে কর ১ কোটি ৩৮ লাখ ৮৮ হাজার ১৩৬ টাকা বেড়ে আদায় হয়েছে ২৪ কোটি ৪৩ লাখ ৫৮ হাজার ৩৫৯ টাকা। ভূমি হস্তান্তর কর ১৮ কোটি ৯১ লাখ ২৫ হাজার ৪২৮ টাকা বেড়ে আদায় হয়েছে ৯৫ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৮ টাকা এবং বিজ্ঞাপন কর ৭ লাখ ৯০ হাজার ৫৬৮ টাকা বেড়ে আদায় হয়েছে ২৫ লাখ ৪৩ হাজার ৫৪৮ টাকা। তবে শপ-সাইন ফি, যান্ত্রিক যানবাহন ফি খাতে চসিকের আয় বিগত অর্থ বছরের চেয়ে কমেছে।
মানুষের ওপর অস্বাভাবিক হারে গৃহকর চাপিয়ে দেয়ায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে জানিয়ে চট্টগ্রাম করদাতা সুরক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক নুরুল আবসার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কর পুনর্মূল্যায়নের নামে অযৌক্তিক গৃহকর বাড়ানো হয়েছে। চট্টগ্রামের স্থানীয় জনগোষ্ঠী ছাড়াও একটি বড় অংশ বাড়ির মালিক বাসা বা ঘর ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল। যে পরিমাণ গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছে তা অনেক গৃহ মালিকের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশন দীর্ঘ সময় পেলেও বাড়ির মালিকদের সঙ্গে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব নিরসন করতে পারেনি। যৌক্তিক হারে গৃহকর আদায় না করলে সিটি করপোরেশনের গৃহকর থেকে অন্যতম প্রধান আয় দিন দিন কমবে। মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া গৃহকর বাতিলের দাবিতে সুরক্ষা পরিষদের আন্দোলন চলবে বলেও সাফ জানিয়ে দেন তিনি।










