ভোর থেকে ‘বাংলার ভেনিস’খ্যাত এ জনপদে চারপাশের গ্রাম থেকে ছোট ছোট কোষা নৌকার খোলে করে চাষীরা নিয়ে আসেন তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। পাইকাররা এসব কিনে বড় ট্রলারে করে নিয়ে যান। তারপর ট্রাকে তুলে পাঠান দেশের নানা প্রান্তে। পেয়ারা কেনাবেচার ব্যতিক্রমী দৃশ্য স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য বাড়ানোর পাশাপাশি দেশী-বিদেশী পর্যটকদেরও আকর্ষণ করছে। তবে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, হিমাগার না থাকা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাবে চাষীরা প্রতি বছর লোকসান গুনছেন। অন্যদিকে প্রচণ্ড রোদ ও তাপপ্রবাহের কারণে এবার প্রতি বছরের তুলনায় কম পেয়ারা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কম-বেশি সব জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পেয়ারার চাষ হলেও বরিশালের বানারীপাড়া, ঝালকাঠি সদর ও পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিকে ঘিরেই মূলত পেয়ারার বাণিজ্যিক চাষ। বরিশালের বানারীপাড়ার ১৬ গ্রামে ৯৩৭ হেক্টর, ঝালকাঠি জেলার ১৩ গ্রামে ৫৬২ হেক্টর, স্বরূপকাঠির ২৬ গ্রামে ৬৪৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। এসব এলাকার হাজার হাজার মানুষের কাছে পেয়ারা জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা বর্ষায় এসব এলাকার নদী-খালজুড়ে পেয়ারার সমারোহ থাকে। প্রতিদিন ভোরে নেছারাবাদের আটঘর-কুড়িয়ানা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠীসহ আশপাশের খালগুলোয় ভেসে আসে শত শত পেয়ারাভর্তি ডিঙি নৌকা। চাষীরা বাগান থেকে তাজা পেয়ারা তুলে এনে আড়তে বিক্রি করেন। পদ্মা সেতু চালুর পর সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় পেয়ারা পরিবহনে গতি এসেছে। তবে বৃষ্টি কম হওয়া ও তাপপ্রবাহে পেয়ারার ফলন কম হয়েছে। এতে চাষীরা খরচও তুলতে পারবেন না বলে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

শুধু ব্যবসা নয়, ভাসমান এ হাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পর্যটনেরও বড় সম্ভাবনা। প্রতিদিনই খালের দুই পাশে পেয়ারা বাগান আর নৌকায় কেনাবেচার দৃশ্য দেখতে ভিড় করছে অসংখ্য দর্শনার্থী। পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে এলাকায় গড়ে উঠেছে বিভিন্ন পার্ক ও রেস্তোরাঁ। বিশেষ করে ভীমরুলির ‘ভাবির হোটেল’-এর সরষে ইলিশ, ইলিশ ভর্তা, চিংড়ি ভুনা ও হাঁসের মাংসের খাবার পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়।

স্থানীয় কৃষক ফরিদ মিয়া বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এ বছর দাম একটু ভালো। তবে পেয়ারায় ছিট রোগ দেখা দেয়ায় কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। এক মণ পেয়ারার মধ্যে পাঁচ-সাত কেজি পর্যন্ত বাদ দিতে হয়। পেয়ারা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। সংরক্ষণের জন্য যদি সরকার হিমাগারের ব্যবস্থা করে, তাহলে কৃষকেরা আরো লাভবান হবেন।’

কৃষক পিন্টু মণ্ডল বলেন, ‘পেয়ারা আমাদের মৌসুমি আয়ের একমাত্র অবলম্বন। পেয়ারার ফলন ভালো হলে আমাদের সচ্ছলতা আসে। পানির ওপরই ভাসমান হাটে বছরে কোটি টাকার লেনদেন হয়। তবে এবার পেয়ারার ফলন কম এবং অ্যানথ্রাক্স রোগাক্রান্ত হওয়ায় পাইকার আগমনসহ সবকিছুতেই একটা খারাপ প্রভাব পড়ছে।’

ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এবার স্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টি না হওয়ায় ফলন কিছুটা কম হয়েছে। তবু ৫ হাজার ৬২৬ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।’