হোটেল পেনিনসুলা চিটাগং এয়ারপোর্ট গার্ডেন। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বন্দরের প্রবেশমুখে কয়েক বছর আগে হোটেলটির নির্মাণকাজ শুরু করে পেনিনসুলা গ্রুপ। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েই হোটেল নির্মাণকাজ শুরু করলেও বর্তমানে এ বহুতল হোটেলের কারণে ট্রানজিট লাইট দেখতে পান না জাহাজের নাবিকরা। এতে চট্টগ্রাম বন্দরে অভ্যন্তরে জাহাজ চলাচল অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে জাহাজ আগমন ও নির্গমনে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। মূলত বন্দরের প্রবেশমুখে ১২তলা ভবনের হোটেল নির্মাণ করায় বন্দরের জাহাজ চলাচলের জন্য বসানো ডায়মন্ড নামক টাওয়ার ব্লক হয়ে গেছে। যার কারণে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নাবিকরা নেভিগেশন কোর্স তৈরির সময় বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বন্দরে প্রবেশ ও বহির্গমনের সময় বন্দরের পাইলটরা জাহাজ পরিচালনা করলেও টাওয়ারের সিগন্যাল লাইট দৃশ্যমান না হওয়ায় ভুল পথে জাহাজ পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রকাশ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বন্দর চ্যানেলে আগমন-নির্গমনকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে দিকনির্দেশনা দেয়ার লক্ষ্যে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন এলাকায় ট্রানজিট বিয়ারিং এলাকায় ডিস্ক ও ডায়মন্ড লাইন নামের দুটি ট্রানজিট টাওয়ার রয়েছে। ট্রানজিট টাওয়ার দুটি বন্দর চ্যানেলে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ নেভিগেশনাল ট্রানজিট মার্ক হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে রাত্রিকালীন নিরাপদ নৌ-চলাচলের ক্ষেত্রে ডিস্ক ও ডায়মন্ড লাইন ট্রানজিট টাওয়ার দুটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশক হিসেবে ভূমিকা পালন করে।

চট্টগ্রাম বন্দরের এ-সংক্রান্ত নথির তথ্য থেকে জানা গেছে, বর্তমানে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে দ্য পেনিনসুলা চিটাগং লিমিটেড, চট্টগ্রাম নামের প্রতিষ্ঠানের নির্মাণাধীন পাঁচ তারকা হোটেল ভবনের জন্য চবকের বর্ণিত ডিস্ক ও ডায়মন্ড লাইন ট্রানজিট টাওয়ার দুটি এবং টাওয়ার থেকে প্রদর্শিত লাইটগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে না। এ কারণে রাত্রিকালে সাগর থেকে বন্দর চ্যানেলে প্রবেশকালে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিচালনা করতে হচ্ছে। যার ফলে সামগ্রিকভাবে বন্দর চ্যানেলে আগমন-নির্গমনকারী বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। রাত্রিকালে ঝুঁকিপূর্ণভাবে জাহাজগুলোকে পরিচালনা করার ফলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল হুমকির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে খোদ বন্দর কর্তৃপক্ষ।

সম্প্রতি জাহাজের নাবিকদের তথ্য ও অভিজ্ঞতার আলোকে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকির পরিস্থিতি দৃষ্টিগোচর হয় বন্দর কর্তৃপক্ষের। বন্দরের কনজারভেটরের পক্ষ থেকে বিষয়টি দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধানের জন্য বন্দরের এস্টেট বিভাগকে একটি চিঠি দেয়া হয়। গত ২৪ অক্টোবর দেয়া ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, রাত্রিকালে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল (সেফ নেভিগেশন) নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন স্থানে চবকের স্থাপনকৃত ডিস্ক ও ডায়মন্ড লাইন ট্রানজিট টাওয়ার দুটিকে সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান করতে ট্রানজিট বিয়ারিং লাইন নির্দিষ্ট রেখে পিলারদ্বয়ের মধ্যে ডায়মন্ড পিলারের উচ্চতা ভূমি থেকে ২৫ দশমিক ৩৩২ মিটার করে পূর্বের স্থান থেকে ২০৭ দশমিক ৭০ মিটার পেছনে নিয়ে যেতে হবে। ডায়মন্ড পিলারের এ পুনঃস্থাপন প্রক্রিয়া হোটেল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের খরচে করার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের এস্টেট বিভাগকে নির্দেশনা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে বন্দরের হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ ও প্রকৌশল বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সময়ের মধ্যে বন্দরের জাহাজ চলাচল ঝুঁকিমুক্ত করতে নির্দেশনা দেয় বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন মো. ফরিদুল আলম।

জানতে চাইলে হোটেল দ্য পেনিনসুলার চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের অনুমোদন নিয়েই পতেঙ্গা এলাকায় আমাদের দ্বিতীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে পেনিনসুলা চিটাগং এয়ারপোর্ট গার্ডেন হোটেলের সিংহভাগ কাজও শেষ হয়েছে। বন্দর ছাড়া সরকারি সব দপ্তর, সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে হোটেল ভবন নির্মাণ করায় কোনো ধরনের আপত্তি থাকার কথা নয়। এক্ষেত্রে বন্দরের আপত্তির বিষয়ে কোনো চিঠি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। 

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের পাইলট ও আন্তর্জাতিক রুটে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানের মেরিন অফিসারের সঙ্গে কথা হয়েছে বণিক বার্তার। তাদের দাবি, প্রতিটি জাহাজ বন্দরে প্রবেশের সময় ক্যাপ্টেনসহ সংশ্লিষ্ট মেরিন অফিসাররা ট্রানজিট লাইটের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্বিঘ্ন জাহাজ পরিচালনার কোর্স তৈরি করেন। বন্দরের প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পয়েন্টে এ ধরনের ট্রানজিট লাইট বসানো রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এখন পর্যন্ত জাহাজ প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা না হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর হিসেবে ডিস্ক ও ডায়মন্ড লাইট দৃশ্যমান না হওয়ার সমস্যা আন্তর্জাতিকভাবে বন্দরের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ডায়মন্ড টাওয়ারের সিগন্যাল দেখা না গেলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে বলে মনে করছেন তারা। জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এসব সমস্যাকে দ্রুত সমাধান করা জরুরি বলেও মনে করছেন তারা।

যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন মো. ফরিদুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, দুটি ট্রানজিট টাওয়ার ৩৭ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল ধরে নাবিকরা বন্দরের অভ্যন্তরে জাহাজ প্রবেশ করান কিংবা বন্দর থেকে জাহাজকে নিয়ে যান। পেনিনসুলা হোটেলটির ভবন নির্মাণের কারণে ট্রানজিট টাওয়ারের ডায়মন্ড টাওয়ারটি ব্লক হয়ে গেছে। যার কারণে ওই টাওয়ারের সিগন্যাল লাইট দেখতে পান না নাবিকরা। বিষয়টি বন্দরের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। পেনিনসুলা হোটেল কর্তৃপক্ষ টাওয়ারের একটি অংশ ভেঙে ফেললে কিংবা অবকাঠামো নির্মাণকাজের অবস্থান পরিবর্তন করলে সিগন্যাল লাইট নিয়ে সৃষ্ট সংকট নিরসন করা সম্ভব হবে।

চট্টগ্রামভিত্তিক পেনিনসুলা গ্রুপ ২০০২ সালে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে দ্য পেনিনসুলা নামে একটি তারকা হোটেল চালু করে। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ২০১৮ সালের দিকে পেনিনসুলা কর্তৃপক্ষ পতেঙ্গা এলাকায় ১৫ একর জমিতে পাঁচ তারকা মানের হোটেল নির্মাণের ঘোষণা দেয়। ২ হাজার ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য হোটেলটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বন্দরের মোহনা অর্থাৎ প্রবেশমুখে নেভাল একাডেমি ছাড়াও চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অবস্থিত। ওই এলাকায় কোনো ধরনের বড় স্থাপনা না থাকলেও বিশেষ বিবেচনায় সব সংস্থার অনুমোদন নিয়েই লিজ নেয়া জমিতে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের কাজ শুরু করে পেনিনসুলা। আগামী বছরের মধ্যে হোটেলটির নির্মাণকাজ শেষে উদ্বোধনের কথা রয়েছে।