স্বৈরাচার পতন ঘটানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রমাণিত সাফল্য রয়েছে। তবে টেকসই গণতন্ত্র বিনির্মাণে আমরা ব্যর্থ বলে উল্লেখ করেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারকে উৎখাত করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রায় ঈর্ষণীয় সক্ষমতা আছে। তবে স্বৈরাচার উৎখাত করার ক্ষেত্রে আমরা যতটা ভালো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা ততটাই খারাপ।’

গতকাল রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর দ্বিতীয় দিনে তিনি এ কথা বলেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। সম্মেলনটি ৩-৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।

মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেন, ‘একটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু এরপর আমরা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হই। ফলে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সবশেষ পতন হয় এরশাদের। ১৯৯১ সালে আমরা গণতন্ত্রে ফিরে আসি। তখন আমরা সত্যিই আশা করেছিলাম, এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ঘটবে। এরপর থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে বেশ কয়েকটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। তবে সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার পরিবর্তে আমরা ক্রমেই সংঘাত ও ধ্বংসের দিকে এগিয়েছি। এর মূল কারণ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ।’ তিনি আরো বলেন, ‘কে কোন দলের সমর্থক, তার ভিত্তিতে সব পেশাই এখন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। সবার সেবা করার শপথ নেয়া চিকিৎসকদের মতো পেশাজীবী থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও এটি ঘটছে। অথচ বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য সাংবাদিকতায় নিরপেক্ষ থাকাটা জরুরি। যে পেশায় বিশ্বাসযোগ্যতাই আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, সেখানে আপনি কীভাবে প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেবেন এবং একই সঙ্গে আশা করবেন যে আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ন থাকবে?’

তিনি বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দল যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়, তখন আমরা জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ হিসেবে সেটিকে উদযান করি। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা দেখতে পাই, নির্বাচনের ফলাফল, অর্থাৎ জনগণের ইচ্ছা জনস্বার্থে রূপান্তরিত হওয়ার বদলে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নেয়।’ তার মতে, পুরো সরকার ব্যবস্থাকে নিজের দলের একটি সম্প্রসারণে পরিণত করা—এখান থেকেই পতনের শুরু।

প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘বিএনপির ৩১ দফার ১১ নম্বর দফায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে মিডিয়া কমিশন গঠনের কথা আছে। নির্ভীক সাংবাদিকতার সুরক্ষা এবং সাংবাদিক নির্যাতনবিরোধী বিশেষ সেল গঠনের মতো প্রতিশ্রুতি দলটির নির্বাচনী ইশতাহারেও রয়েছে। সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতির পর এখনো সংস্কারে তেমন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। দল ও সরকারকে এখনই সংবাদপত্র ও প্রচারমাধ্যম বিষয়ের জরুরি কাজগুলো আরম্ভ করতে হবে, তা না হলে আমরা পিছিয়ে পড়ব।’

তিনি আরো বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতন একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা। তবে প্রায় ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকার দেশবাসীকে অনেকটা হতাশ করেছে। রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের কিছু উদ্যোগ তেমন এগোয়নি। কোনো কোনো কমিশনের প্রস্তাব আলোর মুখই দেখেনি।’

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘নাগরিকদের সব ধরনের সেবা নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার। সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাই আগামী দিনের লক্ষ্য। ত্রাণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে সক্ষমতা অর্জন এবং মানুষকে স্বাবলম্বী করে তুলতে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অর্থনৈতিক সংকটে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও প্রবাসী কার্ডের উদ্যোগ সামাজিক সুরক্ষায় ভূমিকা রাখছে।’

জনগণ এবং সরকারের মধ্যকার আস্থার সম্পর্ক তৈরিতে গুরুত্বারোপ করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘‌নাগরিকদের প্রকৃত অধিকারগুলো নিশ্চিত করার পাশপাশি আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া সরকার এবং ভোটারদের মধ্যকার আস্থার সম্পর্ক সৃষ্টি করা যাবে না।’

আরো বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারি এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইমুম পারভেজ, বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর প্রমুখ।