ঢাকা থেকে পটুয়াখালী যেতে পথে পড়ে পোস্তগোলা সেতু, ধলেশ্বরী সেতু-১, ধলেশ্বরী সেতু-২, দপদপিয়া সেতু, পটুয়াখালী সেতু, শেখ কামাল সেতু, শেখ জামাল সেতু ও শেখ রাসেল সেতু। প্রতিটি সেতুতেই টোল দিতে হয় গাড়িকে। এর বাইরে লেবুখালী ফেরিঘাটেও টোল আদায় করছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। অন্যদিকে পদ্মা পাড়ি দিতে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে টোল আদায় করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।
সেতু ও ফেরিঘাটগুলো পাড়ি দিতে একটি ভারী ট্রাকের খরচ হয় কমবেশি ৪ হাজার টাকা। সাড়ে ৩ হাজার টাকা খরচ হয় একটি বাসের। শুধু বাস কিংবা ট্রাক নয়, টোল আদায় হয় সব ধরনের মোটরযান থেকে।
দেশে যানবাহনপ্রতি কত টাকা টোল বাবদ ব্যয় হয়, তার একটা ধারণা পাওয়া যায় সওজ প্রণীত রোড ইউজার কস্ট প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশে চলাচলরত একটি ভারী ট্রাককে বছরে টোল বাবদ ব্যয় করতে হয় ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। মাঝারি ট্রাকে ব্যয় হয় ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। আর ছোট ট্রাকে ব্যয় হয় ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। একইভাবে বড় বাস চালাতে বছরে ২ লাখ ৩৯ হাজার ও মিনিবাস চালাতে বছরে ৫৫ হাজার টাকা টোল বাবদ ব্যয় করতে হয়। এছাড়া মাইক্রোবাসে ৩৮ হাজার, পরিষেবার গাড়িতে ২০ হাজার, প্রাইভেট কারে ২৩ হাজার, অটোরিকশায় ২ হাজার ও মোটরসাইকেলপ্রতি বছরে টোল বাবদ ব্যয় হয় ৫ হাজার টাকা।
তবে পরিবহন মালিকদের অভিযোগ, দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে যত টাকা টোল আদায় হয়, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হয় মহাসড়কে চাঁদাবাজি। যাত্রীবাহী গাড়ির চেয়ে পণ্যবাহী গাড়িগুলো মহাসড়কে বেশি চাঁদাবাজির মধ্যে পড়ে বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির নেতা মকবুল আহমেদ। তিনি বলেন, পণ্যবাহী একটি ট্রাক চালানোর জন্য প্রতি মাসে অন্তত ৪০ হাজার টাকা শুধু বিভিন্ন পয়েন্টে চাঁদা দিতে হয়। পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতা, পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা এ টাকা আদায় করেন। অন্যদিকে যাত্রীবাহী বাসগুলোতে মূলত টার্মিনালকেন্দ্রিক চাঁদা আদায় করা হয় বলে জানান তিনি। মহাসড়কে চাঁদাবাজির বিষয়টি উঠে এসেছে বাংলাদেশ পুলিশের এক প্রতিবেদনেও। ২০১৯ সালে করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু মহাসড়ক থেকে বছরে ৮৭ কোটি টাকা চাঁদাবাজি করা হয়। পুলিশের প্রতিবেদনটি করা হয়েছিল শুধু জাতীয় মহাসড়ক এবং কেবল রসিদ দিয়ে আদায় করা তথ্য নিয়ে। দেশের অন্যান্য সড়ক-মহাসড়ক ও রসিদের বাইরে আদায় করা চাঁদার হিসাব পুলিশের প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
বর্তমানে দেশের ৬১টি সেতু, ৪৫টি ফেরিঘাট আর তিনটি মহাসড়ক থেকে টোল আদায় করছে সওজ। সদ্য চালু হওয়া ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে থেকে টোল আদায়ের পরিকল্পনাও রয়েছে সংস্থাটির। যুমনা ও মুক্তারপুর সেতুর টোল আদায় করছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু থেকেও টোল আদায় করবে সংস্থাটি। বেশ কয়েকটি রুটে ফেরি সার্ভিস পরিচালনা করছে বিআইডব্লিউটিএ। যানবাহন পারাপারের জন্য মাশুল আদায় করে আসছে সংস্থাটি। পাশাপাশি ঘাট এলাকায় কোনো গাড়ি প্রবেশ করলে আদায় করছে শুল্ক। এসবের বাইরে পিপিপির মাধ্যমে বাস্তবায়িত সড়ক অবকাঠামো থেকে টোল আদায় করছে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশের সড়ক ও মহাসড়ের একটা বড় অংশই ভাঙাচোরা। রাস্তার এ ভাঙাচোরা দশার পেছনে অন্যতম কারণ রক্ষণাবেক্ষণে অপ্রতুল বরাদ্দ। সড়ক-মহাসড়কগুলো উন্নত করতে এবং সবসময় ব্যবহার উপযোগী রাখার স্বার্থে টোল আরোপ যুক্তিসংগত বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, যেকোনো উন্নত অবকাঠামো ব্যবহারের ক্ষেত্রে টোল আরোপ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত একটা ব্যবস্থা। প্রাপ্ত টোলের মাধ্যমে মহাসড়কগুলোর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন করা যায়। তবে টোল আরোপের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমটি বিকল্প ব্যবস্থা রাখা। অর্থাৎ কোনো গাড়ি যদি টোল দিতে না চায়, তাহলে তার জন্য অবশ্যই একটা বিকল্প রাস্তা রাখা উচিত। দ্বিতীয়টি হলো রাস্তার গুণগত মান বজায় রাখা। আমাদের দেশে রাস্তা বানানোর কয়েক দিন পরই তা নষ্ট হয়ে যায়। টোলপ্লাজায় দীর্ঘ যানজট হয়। ছোট ছোট গাড়ি অবাধে চলে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। এসব বিষয় থাকলে টোল আরোপের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। মহাসড়কগুলো থেকে সরাসরি টোল আদায়ের পাশাপাশি যানবাহন থেকে বর্তমানে বিআরটিএ যে রাজস্ব আদায় করছে, তা সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বর্তমানে ৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক, ১৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চট্টগ্রাম বন্দরের সংযোগ সড়ক ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জগদীশপুর-শেরপুর অংশে টোল আদায় করছে সওজ। সংস্থাটি দেশের আরো ছয়টি মহাসড়কে টোল চালুর পরিকল্পনা করছে। জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল, টাঙ্গাইল-রংপুর, ঢাকা-চট্টগ্রাম, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ, গাবতলী-নবীনগর ও ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়ক থেকে টোল আদায়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে এখনো চূড়ান্ত না হলেও টোল আদায়ের বিষয়টি পর্যালোচনা করছে বিবিএ।
পর্যায়ক্রমে দেশের মহাসড়কগুলো থেকে টোল আদায় শুরু হলে যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ড ভ্যান মালিক-শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক রুস্তম আলী খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, এখন সারা দেশে সেতু ও ফেরি পারাপার করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা আমাদের টোলের পেছনেই চলে যায়। নতুন করে মহাসড়কে টোল টালু হলে এ ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। ব্যয়ের এ ভার কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে। নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যতদূর শুনেছি পদ্মা সেতু পার হতে বড় একটি ট্রাকের ২ হাজার ৭০০ টাকার মতো দেয়া লাগতে পারে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, যেন টোলহার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা হয়।
অন্যদিকে আরেক পরিবহন মালিক নেতা ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্লাহ মনে করেন, উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো পেলে টোল দিতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে টোল দেয়ার সময় যানবাহনের প্রচুর সময় নষ্ট হয়। এটা মাথায় রেখে টোল আদায় কার্যক্রম ডিজিটাল করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
টোল আদায়ের পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে বিষয়টি সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে সওজের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, টোলের সঙ্গে মানুষকে সেবা দেয়ার বিষয়টি জড়িত। বিদ্যমান সড়কগুলোতে টোল আদায় করা যুক্তিসংগত হবে না। মহাসড়কগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে সেগুলোতে উন্নত পরিবহন সেবা নিশ্চিত করার পরই টোল আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে দেশের চার লেনের মহাসড়ক, যেগুলোতে যানবাহন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে পারবে সেগুলোই টোল আদায়ে প্রাধান্য দেয়া হবে বলে জানান তিনি।










