কুড়িগ্রাম
ও সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে চারণভূমি নষ্ট হওয়ায় দেখা দিয়েছে গোখাদ্যের সংকট। খামারে থাকা খাদ্যের মজুদও শেষ। এ
অবস্থায় গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চরের খামারিরা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকেও পাননি সহায়তা। নিজেদের বসবাসের ঘর পানিতে ডুবে
থাকলেও গবাদিপশুর জন্য উঁচু ভিটা তৈরি করে সেখানে রেখেছেন। কিন্তু তাতেও মিলছে না রক্ষা। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় অনেকেই নৌকায় করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন গবাদিপশু।
সরজমিনে দেখা যায়, কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে বন্যার পানিতে ডুবে আছে ঘরবাড়ি। ডুবে থাকা প্রায় প্রত্যেক বাড়ির পাশে উঁচু ভিটার ঘরে রাখা হয়েছে গরুসহ অন্যান্য গবাদিপশু। কারো কারো সে ঘরেও পানি ওঠায় গবাদিপশুকে নৌকা করে নেয়া হচ্ছে নিরাপদ স্থানে। টানা ১২ দিন ধরে গবাদিপশুসহ পানিবন্দি অবস্থায় জীবন কাটছে তাদের।
কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারের অববাহিকায় রয়েছে সাড়ে চার শতাধিক চর। এসব চরের বাসিন্দারা কৃষিকাজের পাশাপাশি গরু পালন করে থাকেন। প্রায় প্রত্যেক চরবাসীর ঘরে আছে চার থেকে ২০টি পর্যন্ত গরুসহ অন্যান্য গবাদিপশু। কিন্তু বন্যায় ঘরবাড়িসহ চারণভূমি তলিয়ে থাকায় গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। একদিকে তলিয়ে আছে চারণভূমি, অন্যদিকে পানিতে রেহাই পাচ্ছে না গরু রাখার নিরাপদ স্থান। এছাড়া পানি উঠে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে গরুর খাবার হিসেবে জমানো খড়। সব মিলে তীব্র হয়ে উঠেছে গো-খাদ্যের সংকট।
চরের অধিবাসীরা জানান, পরিবারের বিপদে-আপদে এই গরুই তাদের একমাত্র ভরসা। এ কারণে নিজেরা পানিতে ভাসলেও গবাদিপশু রক্ষার চেষ্টা তাদের। কিন্তু নিজেদের খাদ্য সংকটের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য সংকট নিয়ে মহাচিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জের বালাডোবা চরের আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমার আটটি গরু নিয়ে খুব বিপদে আছি। গরু রাখার জন্য উঁচু ভিটাতেও আর গরু রাখা যাচ্ছে না। পানি উঠে গেছে। এ কারণে নৌকায় করে উঁচু জায়গায় গরু নেয়ার কথা ভাবছি।’
সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের চর ভগবতীপুরের মোজাম্মেল জানান তার ভোগান্তি ও উদ্বেগের কথা। তিনি বলেন, ‘সব ডুবে গেছে। চরের মধ্যে একটু উঁচু জায়গায় গরু রেখেছি। খড়ও নষ্ট হওয়ার উপক্রম। পানিতে নেমে ডুবে থাকা ঘাস কেটে এনে গরুকে খাওয়াচ্ছি। পানি নামলেও গরুর খাবার মেলানো সম্ভব হবে না।’
চরে বসবাসকারীরা জানান, এবারের বন্যায় তারা নিজেদের খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন। পাশাপাশি গোখাদ্যের সংকট চললেও তারা তেমন কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না।
অনেকেই উঁচু জায়গায় গরু, ছাগল ও ভেড়া রেখে গাছের পাতা সংগ্রহ করে খাওয়াচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মোনাক্কা আলী জানান, চরাঞ্চলসহ বন্যাকবলিত এলাকার গবাদিপশুর সুরক্ষায় ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম কাজ করছে। পাশাপাশি তালিকা করে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার কথাও জানান তিনি।
এদিকে বন্যাকবলিত মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্যসহায়তা দেয়ার কথা জানান কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ।
চরগুলোয় লালন-পালন করা গরুর আলাদা পরিসংখ্যান না থাকলেও জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, জেলার নয় উপজেলায় গরুর সংখ্যা সাড়ে আট লাখ। এছাড়া ছাগল, ভেড়া, মহিষসহ অন্যান্য পশুর সংখ্যা প্রায় নয় লাখ।
এদিকে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার পরও সিরাজগঞ্জে আবারো কমতে শুরু করেছে যমুনার পানি। ফলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় বাঁধ, উঁচু স্থানে আশ্রয় নেয়া মানুষ বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছে। চারণভূমি নষ্ট হওয়ায় সেখানেও দেখা দিয়েছে পশুখাদ্যের সংকট।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের চরবেলুটিয়া গ্রামের রহমত আলী বলেন, ‘ঘরবাড়ি-রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। বাড়িতে রান্না করতে পারি না। সব জায়গায় পানি। গরু-ছাগল নিয়ে বিপদে। নিজেদের পাশাপাশি গবাদিপশুর জন্য খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
রাজগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, ‘জেলার পাঁচটি উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার গবাদিপশু পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ সংখ্যা কাজীপুর, সদর উপজেলা ও চৌহালীতের বেশি। চরাঞ্চলে নিচু এলাকার ঘাস তলিয়ে গেছে। এজন্য কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে যমুনার পানি কমতে থাকায় কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। আমরা তালিকা করছি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে গবাদিপশুর জন্য খাদ্য দেয়া হবে। এছাড়া গবাদিপশু যেন রোগাক্রান্ত না হয়, এজন্য পাঁচটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। টিমের সদস্যরা নিয়মিত কৃষক ও খামারিদের পরামর্শ দিচ্ছেন।’










