কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে কয়েক দিন ধরেই দেশে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর করা হয়েছে সরকারি বিভিন্ন স্থাপনায়। চলমান পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এক ধরনের থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গতকাল সারা দেশেই রাস্তাঘাট ছিল অনেকটা জনমানবশূন্য। তবে এদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি না থাকলেও কিছু স্থানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে—
নরসিংদী: জেলার পাঁচদোনায় পুলিশ ফাঁড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সকালে সদর উপজেলার পাঁচদোনা পুলিশ ফাঁড়ি, ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা অফিস, পাঁচদোনা কৃষি অফিস ও মেহেরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষোভকারীরা। এর আগে গত শুক্রবার বিকালে জেলা কারাগারে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় ৮২৬ জন কারাবন্দি পালিয়ে যায়। হামলাকারীরা ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৮ হাজার ১৫ রাউন্ড গুলি লুট করে। হামলার ঘটনায় রাফি (২৮) নামে এক কারারক্ষী গুরুতর আহত হয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কারাগারের জেলার কামরুল ইসলাম।
গাজীপুর: কারফিউর প্রথম দিনে সকাল ৯টা থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে চন্দনা চৌরাস্তার বিভিন্ন অংশে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা। পরে টঙ্গী পশ্চিম ও গাছা থানা, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়, ওআইসি পোশাক কারখানা, গাজীপুর সড়ক ও জনপথ কার্যালয়, বিভিন্ন খাবার হোটেল ও রেস্টুরেন্ট এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা করে।
নারায়ণগঞ্জ: সিদ্দিরগঞ্জের সিমরাইল মোড়, মাদানীনগর, মৌচাক, সানারপাড়, সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীরা সকাল ১০টার দিকে মাদানীনগর এলাকায় তিনটি মাইক্রোবাস পুড়িয়ে দেয়। সকাল থেকে আন্দোলনকারীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সাইনবোর্ড থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত দখলে রেখে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। রাস্তার ওপর টায়ার, ইটের টুকরো ও বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। বিকাল ৪টার দিকে র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী সাইনবোর্ড থেকে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া করলে তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় তারা সানারপাড় এলাকায় একটি গার্মেন্ট এবং সিমরাইল এলাকার ইব্রাহীম শপিং কমপ্লেক্সে অগ্নিসংযোগ করে। সিদ্দিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুজিবুর রহমানের গাড়িও ভাংচুর করে।
লক্ষ্মীপুর: কারফিউয়ের প্রথম দিনে দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত শিথিল করা হলে ঝুমুরের ইলিশ চত্বর এলাকায় অবস্থান নিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় আন্দোলনকারীরা। দাবি আদায়ের আগ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেয় তারা। একই দাবিতে রায়পুরেও বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা।
তবে সকাল থেকেই লক্ষ্মীপুর ছিল থমথমে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় অবস্থান নিয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জরুরি সেবা ব্যতীত বাজারের অধিকাংশ দোকানই বন্ধ ছিল। তবে কারফিউ শিথিলের সময় মানুষ বাইরে বের হয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকানগুলোয় ভিড় জমায়। আবার কারফিউ বহাল হলে মানুষের চলাচল কমে যায়।
লক্ষ্মীপুর সদর থানার ওসি ইয়াসিন ফারুক মজুমদার বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা ঝুমুর এলাকায় বিক্ষোভ করেন। তবে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
মানিকগঞ্জ: কারফিউয়ের খবরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসহ অভ্যন্তরীণ অন্য সড়কগুলোয় যান চলাচল কম ছিল। শহরের বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। মানুষও রাস্তায় খুব একটা দেখা যায়নি। পুরো শহরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আজগর হোসেন জানান, মাঝরাত থেকে কারফিউ জারি করা হলেও শনিবার ভোর থেকে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে মাইকিং করে মানুষকে বিষয়টি নিয়ে জানানো হয়েছে। দোকানপাট বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মানুষজনকে সান্ধ্য আইন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পাঁচ প্লাটুন বিজিবি সদস্য চাওয়া হয়েছে। আপাতত জেলা পুলিশ ও দুই প্লাটুন ব্যাটালিয়ন আনসার নিয়োজিত রয়েছে।
মুন্সিগঞ্জ: আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর জেলাজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পদ্মা সেতু এলাকায় বিভিন্ন পয়েন্টে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া পাবনা, রাঙ্গামাটি, বগুড়া ও রাজশাহীতে সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। ফরিপুরেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। টাঙ্গাইলেও গতকাল কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ভোর থেকে শহরে মানুষের উপস্থিতি কম ছিল।










