দেশের বাজারের একটি অতিপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য হলো ভোজ্যতেল। ৯০ ভাগ আমদানিনির্ভর এ পণ্যটির ওপর ভিত্তি করেই মূলত নিয়ন্ত্রিত হয় দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার। নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববাজার থেকে অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি করে পরিশোধনের মাধ্যমে দেশের বাজারে বিক্রি করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোজ্যতেল বিক্রির পদ্ধতিগত ব্যবস্থায় কিছু ত্রুটি ও তদারকির অভাব রয়েছে, যা এটিকে অতিমূল্যায়িত করছে। লেনদেন পদ্ধতির সমস্যার কারণে সাধারণ ক্রেতা কিংবা পাইকারি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে আমদানিকারকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় পণ্যটির দাম। যার ফলে নানা উদ্যোগ নেয়ার পরও তেলের পাশাপাশি অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার।

দেশের প্রধানতম ভোগ্যপণ্যের বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। বন্দর সুবিধা, ১৫০ বছরের ঐতিহ্য, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতির কারণে প্রধান ভোগ্যপণ্যগুলোর লেনদেন সম্পন্ন হয় এ ঐতিহাসিক বাজারটিতে। এখানে সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হওয়া পণ্য ভোজ্যতেল। এর পরের স্থানে রয়েছে চিনি, গম, ডাল, চালসহ অন্যান্য নিত্য ভোগ্যপণ্য। এসব পণ্যের লেনদেনের বিশেষ পদ্ধতির কারণে ভোজ্যতেল আমদানিকারক ব্যবসায়ীর ক্রয়-পরিশোধন-বিপণন ও মুনাফার চেয়েও অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়। এতে আমদানিকারকদের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি মুনাফা করেন ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান, ডিও/এসও বিক্রেতা ও মধ্যস্বত্বভোগী স্লিপ বেচাকেনায় নিয়োজিত ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা।

বাজার বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোজ্যতেল আমদানিকারক ও পরিশোধন প্রতিষ্ঠান সয়াবিনের এসও বিক্রি করেছে মণপ্রতি ৫ হাজার ৮০০ টাকায়। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক হাজার এসও বিক্রি করে বাজার থেকে অর্থ তুলে নেয়। এত কম দামে এসও বিক্রি করে প্রাপ্য অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববাজার থেকে ভোজ্যতেল আমদানিতে এলসি (ঋণপত্র) খুলেছে কিংবা আগের আমদানি হওয়া ভোজ্যতেলের ব্যাংকের দায় পরিশোধ করেছে। ওই ভোজ্যতেলের এসও (সাপ্লাই অর্ডার) কিংবা এসওর বিপরীতে বিক্রি হওয়া স্লিপের বর্তমান দর ৬ হাজার ৮০০ থেকে ৭ হাজার টাকা। আর সরাসরি ক্রয় করা এসওর দাম ৭ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আমদানির সব খরচসহ ৫ হাজার ৮০০ টাকার লাভ যুক্ত করে বাজারে বিক্রি করেছে সয়াবিন। কিন্তু একই পণ্য মাঠ পর্যায়ে সাধারণ খুচরা ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে ৭ হাজার ৪০০ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকায়। মাত্র কয়েকটি হাত ঘুরেই সয়াবিনের দামের এ বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে শুধু ভোজ্যতেলের লেনদেন পদ্ধতির কারণে।

সরকার ২০১১ সালে ডিও প্রথা (ডেলিভারি অর্ডার) বাতিল করে এসও প্রথা চালু করে। কিন্তু বাজার তদারকির অভাব, ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কৌশলের কারণে সেই এসও প্রথাও ফিরে গিয়েছে ডিও প্রথার আদলে। ফলে বাজার থেকে প্রকৃত আমদানিমূল্যের চেয়েও অনেক বেশি দামে ভোজ্যতেলসহ নিত্য ভোগ্যপণ্য কিনতে হচ্ছে দেশের সাধারণ ক্রেতাদের।

অবশ্য ট্রেডিং পদ্ধতি, স্লিপ বেচাকেনাসহ ভোগ্যপণ্য বাজারের কারসাজির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহমেদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ছাড়াও আসন্ন রমজানের চাহিদার কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এজন্য সরকারের বিভিন্ন নীতিও দায়ী। সাম্প্রতিক সময়ে খোলা ভোজ্যতেল বিক্রি বন্ধের ঘোষণা বাজারকে আরো উসকে দিয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

দেশের ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় বিশ্ববাজারের বুকিং দরের ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় উৎসবকেন্দ্রিক চাহিদা বৃদ্ধি, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বা আমদানি কম হলে তারও প্রভাব পড়ে। প্রতিদিন দেশের পাইকারি বাজারের ক্রেতারা বুকিং দর দেখে তাদের আগে থেকে কেনা এসও বা স্লিপের দাম হাঁকেন। বিশ্ববাজারে বুকিং বেড়ে গেলে ওইদিন স্লিপ বা এসওর দামও বেড়ে যায়। আবার সকালে দাম বাড়লেও বিকালে বুকিং পতন হলে দাম কমে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

সবশেষ গতকাল পাইকারি বাজারে সয়াবিনের দাম মণপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কমে লেনদেন হয়েছে ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকায়, সুপার পাম অয়েল ৬ হাজার ১৫০ থেকে ৬ হাজার ২০০ টাকায়, পাম অয়েল লেনদেন হয়েছে ৫ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার ৮৫০ টাকা দরে। তবে রেডি এসও উল্লেখিত দামে লেনদেন হলেও পাইকারি পর্যায়ে অর্থাৎ মিল থেকে নিয়ে আসা সয়াবিন বা পাম অয়েল মণপ্রতি আরো ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর পরই সয়াবিনের দাম মণপ্রতি ৭ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেলেও গত কয়েক দিনে প্রশাসনের নজরদারি ও অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে দাম কয়েকশ টাকা করে কমে এসেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া দেশীয় মসুর ডাল কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা বেড়ে ১২০ থেকে ১২১ টাকা, আমদানীকৃত মসুর ডাল ৮৯ থেকে ৯০,

মটর (ডাবলি বা অ্যাংকর) ৪৭, মটর ডাল ৪৮ থেকে ৪৯, ছোলা মানভেদে ৬০ থেকে ৭২, আমদানি করা মুগডাল ৭৩ থেকে ৮০, দেশী মুগডাল ১১০, খেসারি ডাল ৬৭ থেকে ৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহে পাইকারি পর্যায়ে কেজিপ্রতি ডালজাতীয় পণ্যের দাম ৪ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। অন্যদিকে ভারতীয় গম বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ১ হাজার ২২৫ টাকায়। চিনির দামে কোম্পানিভেদে কিছু পার্থক্য দেখা গিয়েছে। এর মধ্যে এস আলমের চিনি ২ হাজার ৭০০ টাকায়, মেঘনা গ্রুপের চিনি ২ হাজার ৭১৫ এবং সিটিগ্রুপের চিনি ২ হাজার ৭২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত দুই সপ্তাহে দেশে নতুন করে আমদানি করা কোনো পণ্যের সরবরাহ হয়নি। কিন্তু পণ্যগুলোর লেনদেন পদ্ধতিতে যে বাড়তি দাম পণ্যের ওপর পড়েছে, তা ট্রেডিং ও এসও পদ্ধতির কারণেই হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরাও।

এক সময়ের আলোচিত ডিও বাদ দিয়ে আমদানিকারকরা এসও চালু করলেও এ বিষয়ে সরকারি যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তা শতভাগ প্রতিপালন করছেন না ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ডিলারদের পণ্য সরবরাহ না করায় মুষ্টিমেয় কয়েকজন ট্রেডিং ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি পণ্যবাজার। তাছাড়া ইস্যুর তারিখ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে পণ্যটি মিলগেট থেকে সংগ্রহ করার বাধ্যবাধকতার কথা এসওর গায়ে লেখা থাকলেও সেটি মানা হয় না। বছরের পর বছর পাইকারি বাজারে একটি এসও পড়ে থাকলেও সেটিকে অযোগ্য করেন না মিল মালিক বা আমদানিকারকরা। যার কারণে পাইকারি বাজারে এসও ছেড়ে টাকা উত্তোলনের পর সেগুলো বিভিন্ন হাত ঘুরে বাজার অতিমূল্যায়িত হতে ভূমিকা রাখে। তাছাড়া এসওর গায়ে বিক্রি করা পণ্যের পরিমাণসহ বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ থাকলেও পণ্যের কোনো দাম লেখা থাকে না। যেটিও বাজার অস্থিতিশীল করতে ভূমিকা রাখে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ভোগ্যপণ্যের বাজার শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কব্জায় চলে গেছে। এজন্য সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থাপনাও দায়ী। সরকার ডিও প্রথা বাতিল করলেও নতুন প্রবর্তিত এসও পদ্ধতিও ডিও প্রথার প্রক্সি হিসেবে কাজ করছে। এ কারণে দেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর চাহিদাসম্পন্ন ভোগ্যপণ্যকে অনৈতিক পন্থায় মুনাফা আহরণের খাত হিসেবে ব্যবহার করছে একটি শ্রেণী। আমদানিকারক থেকে ব্রোকার পর্যন্ত ভোগ্যপণ্যের লেনদেন পদ্ধতিকে কারসাজিমূলক বলেও অভিহিত করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১৮ লাখ টন ভোজ্যতেল, প্রায় একই পরিমাণ চিনি, ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টন গমের চাহিদা রয়েছে। রমজান এলেই চিনি ও ভোজ্যতেলের মাসভিত্তিক গড় চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়। বর্তমানে ইউক্রেন-রাশিয়া সংকট ও গ্রীষ্ম মৌসুমের চাহিদাকে সামনে রেখে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার তদারকিসহ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক সত্ত্বেও বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।