যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে বৈকালিক চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম উদ্বোধন হয় ২০২৩ সালের ১৩ জুন। সেবায় রোগ নির্ণয়ের সুবিধাও যুক্ত করা হয়। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকদের পর্যায়ক্রমে রোগী দেখার কথা বলা হয়। তবে অধিকাংশ চিকিৎসক চেম্বারে ঠিকমতো আসছেন না। আবার কয়েকজন বৈকালিক চিকিৎসাসেবা দিতে পারবেন না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন। এ অবস্থায় বন্ধ হতে যাচ্ছে রোগীদের সেবার এ বিশেষ উদ্যোগ।

ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ এ সেবা বন্ধ করে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এতে বিপাকে পড়েছেন রোগীরা। রোগীদের অনেকে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। অবশ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, মাসিক মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হলে বেশির ভাগ চিকিৎসক বৈকালিক চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া বৈকালিক সেবা চালু হলেও প্রচারের অভাবে সেবা নিতে আসে না মানুষ। জুলাই বিপ্লবের পর অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসকদের ঢাকায় আনা হয়েছে। ফলে চিকিৎসক সংকটের কারণে এমনিতেই সেবা বন্ধ হয়ে গেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবায় নির্ধারিত ফি ধরা হয় ৫০০ টাকা। এ টাকার মধ্যে অধ্যাপক পাবেন ৪০০ টাকা, চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতাকারী ৫০ এবং সার্ভিস চার্জ ৫০ টাকা ধরা হয়। এভাবে সহযোগী অধ্যাপক পাবেন ৩০০ টাকা, সহকারী অধ্যাপক ২০০ এবং এমবিবিএস বা বিডিএস ও সমমানের চিকিৎসকরা পাবেন ১৫০ টাকা। এক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতাকারীর জন্য ২৫ টাকা এবং সার্ভিস চার্জ ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর পর থেকে প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ৪২ জন চিকিৎসক সরকার নির্ধারিত মূল্যে চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন। পাশাপাশি রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্যাথলজি বিভাগ স্বল্পমূল্যে সেবা দিয়ে আসছিল। বৈকালিক চিকিৎসাসেবায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ছিলেন ছয়জন, নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এক, নেফ্রোলজি বিশেষজ্ঞ এক, কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ তিন, রিওমাটোলজি বিশেষজ্ঞ এক, সাইকিয়াট্রি বিশেষজ্ঞ এক, অর্থোসার্জারি বিশেষজ্ঞ তিন, সার্জারি বিশেষজ্ঞ চার, নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ তিন, সাতজন গাইনি বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ ছয়জন এবং চর্ম ও যৌন বিশেষজ্ঞ ছিলেন ছয়জন। অল্প টাকায় পরামর্শ দিয়ে সাধারণ মানুষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা গ্রহণ করছিল। কিন্তু বর্তমানে সেবাটি নেই বললেই চলে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক মাস ধরে হাসপাতালে বৈকালিক চিকিৎসাসেবায় দায়িত্বরত চিকিৎসকরা ঠিকমতো চেম্বারে আসছেন না। দায় এড়াতে তাদের সহকারীদের চেম্বারের সামনে বসিয়ে রাখেন। বৈকালিক চিকিৎসাসেবার সুফল মিলছে না বলে খুব বেশি রোগীও আসে না। কোনো রোগী এলে তাদের বসিয়ে রেখে সহকারীরা চিকিৎসকদের মোবাইলে কল দেন। এরপর চিকিৎসক ইচ্ছে হলে সেবা দিতে আসেন। নতুবা রোগীদের টাকা ফেরত দিতে বলা হয়। এতে বিরক্ত হচ্ছে সেবাপ্রত্যাশীরা।

১৬ এপ্রিল মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়া থেকে বৈকালিক চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন রোজিনা বেগম নামে এক নারী। তিনি জানান, তার ছেলে ওবায়দুল্লাহকে ডাক্তার দেখানোর জন্য এসেছিলেন। কিন্তু ডাক্তার বসেননি। তাই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালে এসেছিলেন অল্প টাকায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চিকিৎসাসেবার আশায়।

সরজমিনে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার অধিকাংশ চিকিৎসকের চেম্বার ছিল ফাঁকা। বৈকালিক চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমে কেউ অংশ নেননি। এদিন শিশু বিভাগে ডা. জসিম উদ্দিন, মেডিসিন বিভাগে ডা. মধুসূদন পাল, গাইনি বিভাগে ডা. মাসকিয়া, নাক-কান-গলা বিভাগে ডা. এখলাসুর রহমান ও চর্ম-যৌন রোগ বিভাগে ডা. কানিজ ফাতেমার দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। কিন্তু তারা কেউই বৈকালিক চেম্বারে বসেননি।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর মাসিক মিটিংয়ে বৈকালিক চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। তখন অধিকাংশ চিকিৎসক দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা চেম্বারে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ আসতে পারবেন না বলে দিয়েছেন। কিন্তু সরকারিভাবে নির্দেশনা না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে বল প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।’ তবে তিনি রোগীদের সুবিধার্থে সেবাটি চালু রাখার জন্য সুপারিশ করেছেন।