‘স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও শাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা প্রায়ই সাধারণ প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত হয়। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ বিষয়গুলো কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়। এগুলো সরাসরি রাজনৈতিক শক্তির ব্যবহার, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করে। প্রশ্ন শুধু শাসন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নয়, বরং এ প্রক্রিয়া কাদের জন্য, কীভাবে এবং কোন দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা উপেক্ষা করা যায় না। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি শুধু নির্বাচনী ভাষণে সীমাবদ্ধ না হয়ে বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।’

গতকাল রাজধানীর সিরডাপে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শাসন প্রক্রিয়া’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।

অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক মুহাম্মদ শওকত আলী হাওলাদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম জাহিদ, কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা হাবিবা, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক দিদার ভুঁইয়া, সাবেক সচিব ও বিপিএটিসির সাবেক রেক্টর একেএম আব্দুল আউয়াল মজুমদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামসুন নাহার খানম, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসীসহ অন্যরা।

এ সময় জিল্লুর রহমান আরো বলেন, ‘শাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে দুর্নীতি, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এবং প্রশাসনিক অপব্যবহার যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয় এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে। এ সংকট নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’

অনুষ্ঠানে সেলিম জাহান বলেন, ‘নির্বাচিত সরকার কোনো দলের সরকার নয়, এটি পুরো দেশের সরকার। নির্বাচিত সরকার যদি জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে কথা বলে তাহলে তা দূর করতে হবে। দায়বদ্ধতা আসলে নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে। এর পেছনে নৈতিক দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি চালু করতে হবে।’

আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আমাদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী যে ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। আগামী যে সরকার আসুক না কেন, তা যেন জনগণের সরকার হয় এবং সেই সরকার যেন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ভেতর এবং বাইরের সব সমস্যা মোকাবিলা করতে পারে।’

আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ‘ট্রাম্প বিশ্ব ব্যবস্থার যে জায়গায় নিয়ে গেছে, সেখানে ছোট দেশগুলোতে স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা থাকবে কিনা তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। ট্রাম্প প্রশাসন কেন আমাদের দেশের একটি নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে চায় তা নিয়ে জানতে হবে এবং তা নিয়ে প্রতিবেদন করতে হবে।’

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার জাতির কাছে দায়বদ্ধ হলেও কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়। গত ১৮ মাসে উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি, যা আমাদের আস্থাহীনতার কারণ। বর্তমান সরকার বিগত সরকারের দুর্নীতির ওপর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করছে, কিন্তু আমি মনে করি অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতি নিয়েও একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন।’

সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘১২ তারিখের পরে আমাদের জন্য কি আরো বিপর্যয় অপেক্ষা করছে? এত বিপর্যস্ত অবস্থায় আমরা থাকতে চাই না। এ সরকার এখন লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। কোনো সরকারই কথা রাখেনি। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শাসন যদি রাজনৈতিক দলের মধ্যে না থাকে, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এগুলো কীভাবে নিশ্চিত হবে? রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে আমাদের রাজনৈতিক দলের সংস্কার করা বেশি প্রয়োজন। তাহলেই দেশের সব স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।’

নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘আমরা এখন আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরপেক্ষ একটি সরকারের অধীনে আছি। কিন্তু তারাই বলে একটি তরুণ দল থেকে অনেক সংসদ সদস্য আসবে। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে স্বচ্ছতা কোথায়? গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমরা কি আজও পেয়েছি?’