করোনায় বিপর্যস্ত পরিস্থিতির মধ্যেই চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছিল সরকার। এরই মধ্যে অর্থবছরের অর্ধেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। শুরু হয়েছে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি। কিন্তু বিদায় নেয়নি করোনা। তাই করোনা মোকাবেলায় একগুচ্ছ অগ্রাধিকার খাত থাকছে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটেও।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে বাজেটের আকার সামান্য বাড়িয়ে ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ঘাটতি ধরা হচ্ছে জিডিপির ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। আর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশ নির্ধারণ করতে চায় সরকার। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় বাজেট নিয়ে এসব প্রাক্কলন অনুমোদিত হয়। তবে এসব প্রাক্কলনই চূড়ান্ত নয়। এ বিষয়ে একাধিকবার বৈঠক ও বেসরকারি বিভিন্ন খাতের সঙ্গে আলোচনা করে বাজেট চূড়ান্ত করা হবে।

ওই সভায় আগামী বাজেটে একগুচ্ছ খাতকে অগ্রাধিকার দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে করোনার প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় সরকারের অগ্রাধিকার খাতগুলোয় প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের সফল বাস্তবায়ন, করোনা নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ, প্রণোদনা এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং অধিক খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ ও বীজে প্রণোদনা, কৃষি পুনর্বাসন, সারে ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত রাখা।

এছাড়া ব্যাপক কর্মসৃজন ও পল্লী উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ, সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতা সম্প্রসারণ, গৃহহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহনির্মাণ করে দেয়ার কার্যক্রম জোরদার করা, নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে বিনা বা স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা চালু রাখা এবং শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ সার্বিক মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যক্রম গ্রহণ করার সিদ্ধান্তও হয় ওই বৈঠকে।

আগামী বাজেট প্রণয়ন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আজিজুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, চলতি বছরের করোনা পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা নিয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। করোনার প্রভাবকে মোকাবেলা করে দারিদ্র্য নিরসন কার্যক্রমকে জোরালো করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো, উন্নয়ন প্রকল্প ঠিকমতো এগিয়ে নেয়াসহ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো যেন তাড়াতাড়ি বাস্তবায়ন শুরু করা যায়, সেটাতেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে আগামী বাজেটে।

করোনার মধ্যেই চলতি অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেন অর্থমন্ত্রী, যা বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন। চলতি অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া কর ব্যতীত রাজস্ব প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩৩ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার কিছুটা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছর মোট বাজেট ঘাটতি ধরা হয় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬ শতাংশ। আগামী বছরে বাজেট ঘাটতি বেড়ে দাঁড়াবে ২ লাখ ৬ হাজার ৬১ কোটি টাকায়, যা হবে জিডিপির ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি বাজেটে জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৩১ লাখ ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ধরা হয় ৮ দশমিক ২ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে করোনার প্রভাব তেমন থাকবে না এই আশায় জিডিপির আকার ধরা হচ্ছে ৩৫ লাখ ৫২ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হবে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া চলতি অর্থবছর মূল্যস্ফীতির হার নির্ধারণ করা হয় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। আগামী অর্থবছর সেটি আরো কমিয়ে ৫ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় সরকার।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ৭ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা বেশ কঠিন হবে। তবে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৩-এ নামানো না গেলেও হয়তো সাড়ে ৫ বা ৬-এর ঘরে থাকবে। বাজেটে যেগুলো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, তার অধিকাংশই প্রতি বছর অর্জিত হয় না। বরাবরের মতো আগামী বাজেটেও একই পরিস্থিতি দাঁড়াবে। করোনার কারণে অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে তা তো সম্পূর্ণ প্রশমন করা যাচ্ছে না। প্রণোদনা দিয়ে হয়তো মানুষের জীবনযাত্রার মান কিছুটা রক্ষা করা যায়, তবে সাপ্লাই চেইন ঠিকমতো কাজ না করলে তো উৎপাদন ব্যাহত হয়। উৎপাদন ব্যাহত হলে প্রবৃদ্ধিও ব্যাহত হয়।

চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছিল ৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এছাড়া করোনা মহামারী মোকাবেলায় যেকোনো জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ এবং স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান গবেষণায় আলাদাভাবে ১০০ কোটি টাকার একটি বরাদ্দও রাখা হয়েছে। আগামী বাজেটেও বরাদ্দের দিক দিয়ে স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।